শারদীয় দুর্গোৎসব সার্বজনীন হউক
ড: মিহির কুমার রায়: প্রতি বছরের মতো এবারো দুর্গোৎসবকে ঘিরে দেশব্যাপী আনন্দ-উৎসবের ফল্গুধারা বয়ে চলছে শরতের শুভ্র আকাশ, কাশফুলে হাওয়ার নাচন আর আগমনী ঢাক-শাঁখের আওয়াজ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
গ্রাম-নগরে ধনী-গরিব ছোট-বড় সবাই মিলিত হন শরতের মিলনোৎসবে এবারের দূর্গাপুজা পড়েছে আশ্বিন মাসে যা শরৎ কাল নামে পরিচিত এবং দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ফলে সাশ্রয়ী অর্থ মানবতার সেবায় গরীবদের মধ্যে বিতরন করা হচ্ছে বলে সার্বজনীন পূজা উজ্জাপন কমিটি জানিয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে এটি হিন্দু ধর্মের প্রধান অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত এই শারদীয় দুর্গোৎসব যা বাঙ্গালী সনাতন হিন্দু ধর্মলম্বীদের সবচাইতে বড় উৎসব হলেও এখন সেটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
কথায় বলে ধর্ম যার যার উৎসব সবার। এই ধারনায় বাংলাদেশের সকল বাঙ্গালী ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে এর আমেজ আনন্দ উপভোগ করে আসছে কালান্তরে। ওপার বাংলার বারো ইয়ার মানে বারোজন বন্ধুর অপার উৎসাহে যে পূজার শুরু তার নামেই চালু হয়ে গেল বারোয়াড়ি তথা সর্বজনীন শারদ উৎসব। বাংলাদেশ ও উভয় বাংলার সীমানা পেরিয়ে এই উৎসব এখন এমন এক রূপ ধারণ করেছে যার সঙ্গে আর কিছুর তুলনা চলে না।
দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় একটা দিক আছে। শাস্ত্রীয় গ্রন্থ থেকে তুলে দিই : ‘মহিষাসুর দেবগণকে স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়া স্বর্গরাজ্য অধিকার করেন। দেবগণ বিপন্ন হইয়া ব্রহ্মার শরণ লন। ব্রহ্মা দেবতাদিগকে সঙ্গে করিয়া মহাদেবের নিকট উপস্থিত হন এবং মহেশ্বরের নিকট দেবতাদিগের দুর্দশা বর্ণনা করেন। মহাদেব ক্রুদ্ধ হইলেন; তাঁহার বদন হইতে এক তেজ নির্গত হইল।
ব্রহ্মা ও অন্য দেবগণের মুখ হইতে এক তেজোরাশি নির্গত হইল। সমবেত তেজোরাশি এক রমণী মূর্তি পরিগ্রহ করিল। দেবতাগণ স্ব স্ব আয়ুধ এই রমণীকে প্রদান করেন। এই দেবীই মহিষাসুরকে তিনবার নিধন করেন।
প্রথমবার উগ্রচারূপে, দ্বিতীয়বার ভদ্রকালীরূপে ও তৃতীয়বার দুর্গারূপে।’ বিভিন্ন শাস্ত্রীয় গ্রন্থে দুর্গার আবির্ভাবের কথা নানা ভাষায় বর্ণনা করা হলেও মূল বক্তব্য এই। এই বক্তব্য অনুসারে কিন্তু দুর্গা ঐক্যের প্রতীক বা দুর্গা ঐক্যবদ্ধ মিলিত শক্তি।
অন্যভাবে বলা যায়, ঐক্যের সাধনাই দুর্গার সাধনা। উৎসবও মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। সেদিক থেকে দুর্গাপূজার আরেক নামই তো উৎসব!অবাঙালি হিন্দুদের কাছে রাম যতটা পূজিত, বাঙালি হিন্দুদের কাছে ততটা নন। কিন্তু বাঙালিরাই রামের সেই অকালবোধনকে অনেক বড় করে পালন করে। তারা অবশ্য সময়পরম্পরায় দুর্গাপূজাকে সর্বজনীন করে ফেলেছে।
দূর্গা পূজার একটি দার্শনক দিক আছে। হিন্দু ধর্মে সাকার ও নিরাকার উভয় প্রকার উপাসনার ব্যবস্থা আছে। উপনিষদের ঋষিরা ছিলেন মূলত নিরাকারবাদী। তাঁরা নিরাকার ব্রহ্মোপসনার কথা বলেছেন। ওম্ (ওঁ) ছিল সেই নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীক। বেদে একেশ্বরবাদের কথাও আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এবং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’। অর্থাৎ সেই সদ্বস্তু বা ঈশ্বর এক, মানুষ তাঁকে বহু বলে থাকেন। বিভিন্ন দেবদেবী মূলত সেই এক ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপভেদ মাত্র।
হিন্দু ধর্মে পরব্রহ্ম বা ঈশ্বরের শক্তিকে মাতৃরূপে কল্পনা করে তাঁর পূজা করা হয়। দুর্গা, কালী, চ-ী, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রভৃতি সেই ব্রহ্মশক্তিরই মাতৃরূপ। পুরাণে এই মাতৃরূপকে নানা নামে অভিহিত করা হয়েছে।
বেদে বিশ্বস্রষ্টাকে ব্রহ্ম, পরমাত্মা, পুরুষ প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করা হয়েছে। দেবী দুর্গা এবং বিভিন্ন মাতৃদেবী ব্রহ্মশক্তিরই মূর্ত প্রতীক। শাক্তদের মতে, ব্রহ্ম এবং তাঁর শক্তি অভিন্ন।
তাই শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন- ‘যেমন জল ও তাহার তরলতা, দুগ্ধ ও তাহার ধবলত্ব, মণি ও তাহার জ্যোতি, সমুদ্র ও তাহার তরঙ্গ; তেমনি ব্রহ্ম ও তাহার শক্তি অভিন্ন।’ ব্রহ্মের তিনটি শক্তি: জ্ঞানশক্তি, ইচ্ছাশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি।
এই ব্রহ্মশক্তি প্রকৃতির সর্বত্র বিরাজিত। দেবী দুর্গা এই
শক্তিত্রয়ের সমষ্টি। দুর্গা, গৌরী, নারায়ণী কাত্যায়নী, শিবদূতী, চ-ী, চ-িকা, চামু-া, কালী, ভদ্রকালী, মহামায়া, জগদ্ধাত্রী প্রভৃতি শক্তিরূপিণী মূর্তি দুর্গারই বিভিন্ন নাম।
মহাভারত অনুসারে দুর্গা বিবেচিত হন কালী শক্তির আরেক রূপে। দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী তাই দেবী মাতা হিসেবেও তার পূজা হয়ে থাকে। কৃত্তিবাসী রামায়ণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দুর্গাপূজা করার কথা উল্লেখ আছে। সনাতন ধর্মের আর্য ঋষিরা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে দেবী দুর্গার আশীর্বাদ লাভের জন্য আরাধনা করতেন।
আজো বাংলায় শ্রী শ্রী চৈতণ্যের- নামে সাতশত শ্লোক বিশিষ্ট দেবী মাহাত্ম্য পাঠ দুর্গাপূজার প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। দুর্গাপূজার প্রচলন নিয়ে বেশ কয়েকটি মতবাদ পাওয়া যায়।
মার্কন্ডেয় পুরাণ মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথ খ্রিষ্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে উড়িষ্যা) দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন ইতিহাস বলছে দুর্গা পুজার প্রচলন এ দেশে শুরু হয়েছিল পনের শতকের শেষের দিকে এবংএ নিয়ে অনেক কল্প কথা রয়েছে।
দেশের উত্তরঞ্চলীয় জেলা রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার তাহিরপুরের জমিদার রাজা হরি নারায়ণের তনয় কংস নারায়ন দুর্গা পুজার আয়োজন করেছিলেন যা সেই সময়কার মূল্যে খরচ হয়েছিল নয় লাখ রুপি যা ছিল অত্যন্ত যাকজমক পূর্ণ। আরও কল্পকথা আছে যে দিনাজপুরে এবং মালদহের জমিদারগন বঙ্গ দেশে প্রথম আচলা দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন।
আবার তৃতীয় আরও একটি মতবাদ রয়েছে যে ১৭৫৭ সালে ইংরেজ শাসক লর্ড ক্লাইভ এর সম্মানে কলকতার জমিদার রাজা নবকৃষ্নদেব জাগজমক পূর্ণ ভাবে এই পূজার আয়োজন করেছিলেন যা বাংলাদেশে শরৎকালে শারদীয় এবং বসন্তকালে বাসন্তী নামে দুর্গাদেরকে পালন করা হয়।
আর সমগ্র আয়োজনের পক্ষটি দেবীপক্ষ নামে খ্যাত। পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন দেবীপক্ষের সূচনা হয়। দিনটি মহালয়া নামে পরিচিত এই পুজা দশদিনের পর্ব যা শুরু হয় শুভ মহালয়া দিয়ে যা এই বছর পড়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ই আশ্বিন ১৪২৯ রবিবার আমবস্যা রাত ১২/৫৩/১৪ সে: পর্যন্ত সেখানে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের মৃত পুর্ব পুরুষদের জল ও খাদ্য দিয়ে তর্পন করে এবং এই দিনে র্দুগা দেবী তারা স্বামীর বাড়ী কৈলাস থেকে মর্তে রওয়ানা হন।
এ বৎসর দেবীর আগমন হাতিতে চড়ে এবং গমন নৌকায়। মহালয়ার দনি অতি প্রত্যুষে চন্ডীপাঠ করার রীতি রয়ছে। আশ্বিন শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে দৌহিত্র মাতামহরে র্তপণ করনে। শ্রাদ্ধকর্তাকে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ধুতি পরে শ্রাদ্ধ করতে হয়।
মহালয়ার দিন ভোর বেলাতেই ঘুমই ভাঙে বেতার বা টেলিভিশন র্বাতায় (মহালয়ার গান-‘বাজল তোমার আলোর বেণু’) শুনে বা র্মত্যে দেবী আগমনরে নাট্যরূপ দেখে। অবসান হয় পিতৃপক্ষের, সূচনা হয় দেবীপক্ষের।
বছর ঘুরে আনন্দময়ীর এই আগমন সান্নিধ্যে বাঙালি তার দুঃখ যন্ত্রণা ভুলে কিছুটা আনন্দ পেতে চায় মধুকটেব বিনাশিনী, মহিষাসুরদর্মিনী মহাদেবীর আবির্ভাব ঘটে মহালয়ার পবিত্র মুর্হুর্ত।
দুর্গা পুজার সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ দিন হলো মহা যষ্ঠী ১৯ আশ্বিন,১৪২৯, ১ অক্টোবর ২০২২ শনিবার দুপুর ২ টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত যে দিন ভক্ত পূজারী বৃন্দ দেবীকে সম্বর্ধনা জানায় যার মধ্য দিয়ে শারদীয় উৎসবের শুভ উদ্বোধন হয়।
তারপর পর্য্যায়ক্রমে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী,দশমী (৫ অক্টোবর ) যার মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানানো হয় তার স্বামী সহ সকলকে নিয়ে শুশুরালয়ে কৌলাসে গমন।
দেবীপক্ষের সমাপ্তি হয় পঞ্চদশ দিনে অর্থাৎ পূর্ণিমায়। এই পঞ্চদশ দিনটিতে বাৎসরিক লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয় সার্বজনীন এই দুর্গাপূজা মূলত পাঁচদিনের অনুষ্ঠান হলেও বাস্তবে মহালয়া থেকে উৎসবের সূচনা এবং লক্ষ্ীপূজায় তার সমাপ্তি।
দুর্গা পুজায় দুর্গার সাথে বাহনে থাকেন তার সন্তানগন যেমন লক্ষী (ধন সম্পদের প্রতিক), স্বরস্বতী (জ্ঞানের প্রতিক), গনেশ (শুভ সুচনার প্রতীক) এবং কার্তিক (যুন্ধ বিদ্যার প্রতিক)। এটা ধরেই নেয়া হয় দুর্গা দেবী তার সন্তানদের নিয়ে কৈলাসে থেকে মর্ত্যে আসেন আবার দশদিনে শেষে নিজের ঘরে ফিরে যান।
দুর্গা পূজরি অনুষ্টানদির মধ্যে রয়েছে রোধন (welcome the goddess), অধিবাস (symbolic offerings to durga),নব পঞ্জিকা স্মান (bathing with holy water), স্বামী পূজা ও অষ্টমী পূজা (celebrate with puspanjhali),ওমা ও ভোগ (fire oblation), কুমারী পূজা, সিন্ধর খেলা ও ইমারশান (দশম দিনে বিজয় দশমীতে মহিলাদের দুর্গার কপালে সিঁদুর পড়ানো নিজেদের মধ্যে সিদুর পড়ানো ও বিদায়), ও ধোনটি নাচ ইত্যাদি প্রানীর নামে বিসর্জন সাধারনত: নেপাল,পশ্চিম বাংলা,আসাম ও ওরিষ্যার মন্দিরে দেয়া হয় যার মধ্যে আছে মহিষ, ছাগল,পাঠা ইত্যাদি।
দেবী দুর্গা বিভিন্নরূপে এ মর্তের পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে থাকেন এবং আমাদের সার্বিক মঙ্গল নিশ্চিত করেন বিধায় তিনি সর্বমঙ্গলা। মায়রে দুইরূপ একটি ভয়ংকরী অপরটি ক্ষেমংকরী। দুষ্টের জন্য অতি ভয়ংকরী আবার শিষ্টের জন্য অতি ক্ষেমংকরী। আবার শিবের শক্তি বলেও তিনি শিবা। কারণ তিনি সব প্রার্থনা এবং আরাধনা মন্জুর করেন এবং অসাধ্যকে সাধন করেন। তাই তিনি শরণ্য, তিনি গৌরী। দুর্গা দশভূজ নামেও পূজিত এবং আরোধিত হয়ে থাকেন।
এখানে নিয়ম আছে নদীর পাড় এবং পতিতালয়ের দরজা থেকে মাটি সংগ্রহ করে প্রতিমা তৈরি করা যার সাথে খড় পাট সহ আরও উপকরন মিশিয়ে কাঠামোটিকে শক্তিশালী করা হয়। এই প্রতিমা তৈরির কাজটি একটি গ্রুপ যাদেরকে বলা হয় থাকে কুমার তারাই বিশেষ ভাবে পারদর্শী যদিও বর্তমানে সময়ে আর্ট কলেক /ইনিষ্টিটিউট থেকে পাস করা অনেক আর্টিষ্ট মৃত শিল্প কাজে প্রতিমা তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছেন যেখানে ধর্ম কোন বিষয় নয়।
শ্রী দুর্গা বার মাসে বার রুপে আমাদের মাঝে আর্বিভুত হয় এবং বাংলাদেশ সহ পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, ওরিষ্যা, আসাম ও ত্রিপুরাতে এই পুজার প্রচলন রয়েছে এবং এর বাহিরেও হিন্দি ভাষা ভাষি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এ পুজার অনুষ্টান হয় ভিন্ন আচার রিতি রীতি নিয়মাচারে।
যেমন পশ্চিম বঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় দুর্গাপুজাকে বলা হয় আখাল বোধন যার অর্থ অসময়ের দেবীর পুজা শারদীয় পুজা যা শরৎ কালের প্রতিক, শারদ্যোৎসব, মহা পূজা, মায়ের পূজা ও পূজা।
কিন্তুু বাংলাদেশে ঐতিহাসিক ভাবে দুর্গা পাুজাকে আবারও বলা হয় শক্ত হিন্দু উৎসব যেমন নভরত্রী যা একি দিনে পালিত হয় ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যেমন গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, কেরালা এবং মহারাষ্ট্রে।
আবার কুল্লু দেশিরা পালিত হয় কুল্লু উপত্যকায়, হিমাচল প্রদেশে, মাইশোর, কর্নাটক এবং বোম্বাইএ গোলে নামে পালিত হয়, তামিলনাডুতে বম্মালা কুলুড নামে পালিত হয়, অন্দ্রপ্রদেশে ও তেলেনঙ্গানা বাথুকামা নামে পালিত হয়।
এই দুর্গা পূজায় প্রথমে রাজাদের অনুদান শুরু হয়েছিল যেমন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যোর রাজধানী আগতলা দুর্গাবাড়ী মন্দিরে রাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুর কর্তৃক প্রথম দুর্গা পুজা শুরু হয়েছিল।
দুর্গা পূজা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল নিয়ম সিন্ধ (complicated rituals) একটি ধর্মীয় কার্য্যক্রম যা কেবল সম্পদশালী ধনী ব্যক্তিদের দ্বারই আয়োজন সম্ভব ছিল। কিন্তু পরবর্তিতে ১৯ শতকের শেষ ভাগে কলকাতা ও পূর্ব বঙ্গের মধ্যশ্রেনীর সনাতন ধর্মালম্বীগন এই প্রথার একটি রুপান্তর আনয়ন করেছিলেন যাকে বলা হয় কমিউনিটি ভিত্তিক সার্বজনীন পুজা এবং অঞ্চল ভিত্তিক বিভিন্ন পুজা।
কমিটির দলে ভাগ হয়ে আয়োজন করে পুজার বিশাল ব্যয়ভার বহর করার জন্য বিশেষত: প্যান্ডেল তৈরি, আলোক সজ্জা, প্রতীমা তৈরি, পূজা আচনা, প্রতীমা সাজসজ্জা, ভক্ত সহ অতিথী আপ্যায়ন, ডাকডোল বায়না, ধর্মীয় পালাগান আয়োজন ইত্যাদি।
দুর্গা পুজা একটি ধর্মীয় উৎসব হলেও সময়ের আবর্তে বর্তমানে তা সামাজিক ও সাংস্কতিক উৎসরে পরিণত হয়েছে সত্যি কিন্তুু এর একটি রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে। কারন দেশের রাজনৈতিক দল ও সরকার শারদীয় দুর্গোৎসবে মোটা অংকের টাকা অনুদান হিসাবে ডোনেসন দিয়ে থাকে আবার বারোয়ারী পুজা মন্ডপ গুলোর আয়োজকদের চাউল ,চিনি, ডাল ইত্যাদি সরবরাহ করে থাকে।
সরকার প্রধান প্রতি বছর হিন্দু কল্যান ট্রাষ্টের মাধ্যমে অনেক অনুদান দিয়ে থাকে। শারদীয় উৎসবকে ঘিরে সাহিত্যেও বলয় সৃষ্ঠি হয়,নতুন লেখকের র্সৃষ্ঠি হয় এবং পূজা সংকলন নিয়মিত প্রকাশ হয় যা সাহিত্যের বাহক কিংবা সংস্কৃতির বাহক।
ঢাকার বড় বড় পূজা উজ্জাপন কমিটির পক্ষ থেকে পূজা সংকলন বাহির করা হয় যা দিন দিন বাড়ছে। দেশের প্রথম শ্রেনীর পত্রিকা গুলো শারদীয় উৎসবকে ঘিরে বিশেষ ক্রোর পত্র প্রকাশ করে এবং সরকারী/বেসরকরী টেলিভিশন গুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে ।
বাংলাদেশে দুর্গা পূজার মন্ডপ গুলোতে মহা সপ্তমী থেকে মহা দশমী পর্যন্ত বিপুল পুজারীর সমাগম হয় এবং গত ২০২১ শে আঠাশ হাজারেরও বেশি পুজা মন্ডপ পারিবারিক ও বারোয়ারী ভাবে অনুষ্টিত হয়েছিল। বাংলাদেশ পুজা উজ্জাপন কমিটি ও ঢাকা মহানগর পূজা উজ্জাপন কমিটি সার্বিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষন করে থাকেন।
দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকততা খুবি জটিল যা পন্ডিত ও তার সহযোগিদের দ্বারা পরিচালিত হয় যেমন মহা সপ্তমীতে পুজারম্ব, অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরন, সন্ধা আরতি, মহাষ্টমিতে সন্ধি পুজা, কুমারী পুজা ( রামকৃষ্ন মিশন মট), অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরন, সন্ধা আরতি; মহানবমী পুজারম্ভ, অঞ্জলী প্রদান,চন্ডী পাঠ, সন্ধ্যা আরতি এবং সর্বশেষ বিজয়া দশমী পুজারম্ভ ,দর্পন বিসর্জন ও শান্তির জল গ্রহন, সিঁদুর পরানো ও প্রতিমা বিসর্জন।
দুর্গাপুজার ধর্ম্মীয় আচরনের মধ্যে রয়েছে ভক্তীমুলক গান, ডজন, যাত্রা পালা, লক্ষী বিলাস,নৈাকা বিলাশ, নিমাই সন্নাস ইত্যাদি। এদের আয়োজনটি থাকে সূচনা হয় দূর্গাপূজার সময় থেকে আর শেষ হয় পহেলা বৈশাখের (১৪ই এপ্রিল) অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।
এমনিতেই এই যাত্রা শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে তার উপর মরার উপরে খারারর ঘায়ের মত তার উপর মানুষ সৃষ্ঠ দুর্য়োগ সার্বিক আনন্দকে ম্লান করতে দেয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলে এই পূজার গুরুত্ব অপরিসীম বিশেষত: শিল্পী কুশলীদের বা সাজ সজ্জায় নিয়োজিত সংস্থা গুলোর মধ্যে শারদীয় উৎসবকে ঘিরে ব্যবসা বানিজ্যের যে প্রসার তা এই খাতটিকে প্রসারিত করে থাকে। যেমন ফুল-ফল , ডাকি, বাদ্য বাজনা, কাপড় চোপড় বিতরন, প্রতিমা শয্যা, অলংকরন,মুদ্রন শিল্প, ভোগ্য পণ্য যেমন চাল, ডাল, শাড়ী ক্রয় বিক্রয়, মিষ্টি ইত্যাদি।
প্রতি বছরই এই দিনটির জন্য ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করে থাকেন যা দেশের সংস্কৃতি ,ব্যবসা বানিজ্য ও সামাজিক উন্নয়নের এক অপূর্ব নিদর্শন। এই বৎসর দেবীর ঘোটাকে আগমন ও গমন ।
ঢাকা শহরের পূজা মন্ডপ গুলোর মধ্যে ডাকেশ্বরী মন্দিরও রামকৃষ মিশন, বনানী ও কলাবাগান র্সাাজনীন পুজা মন্ডপ, সনাতন সমাজ কল্যান সংঘ পুজা মন্ডপ খামারবাড়ী, শাখারী বাজার, পূজা মন্ডপ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ পুজা উজ্জাপন পরিষদের সাধারন সম্পাদকের মতে এবার সারা দেশে প্রায় ৩২ হাজারের মত স্থায়ী ও অস্থায়ী পুজা ম্ন্ডপ স্থাপিত হতে পারে যার মধ্যে রাজধানী ঢাকাতে মন্ডপের সংখ্যা প্রায় দুইশতের মত।
পুরাতন ঢাকার লালবাগ থানার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির কর্তৃপক্ষ পাঁচদিনে বৃহৎ আকারে কর্মসুচি ঘোষনা করেছে যার মধ্যে রয়েছে ভক্তি মুলক গান পরিবেশন, গরীবদের মধ্যে বন্ত্র্য বিতরণ, মহা প্রসাদ বিতরণ, আরতী প্রতিযোগিতা, সেচ্চায রক্তদান কর্মসুচি ও বিজয়া দশমির পর্ব।
বাংলাদেশের পূজার জগৎ অনেকটা পারিবারিক গন্ডি পেড়িয়ে এখন দেশে কিংবা বিদেশে বিস্তৃতি ঘটেছে বিশেষত: যেখানে বাঙলা ভাষা ভাষিরা আছে যেমন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রা, যুক্তরাজ্রো ও ভারতে। উংসবের আমেজ যত বাড়ে ততই ব্যাপ্ত হয আনন্দের সীমানা।
পূজার মৌসুমে অনেকেই দেশে আসে আত্মীয় স্বজনদের সাথে পূজা উজ্জাপন করতে এবং আশা করা যায় আগািমতে এক অসাম্প্রদািয়ক বংলাদেশ গড়তে শারদীয় দুর্গোৎসব বিশেষ ভুমিকা রাখবে।
দুর্গাপূজা হয় দুর্গা উৎসব—সর্বজনীন দুর্গোৎসব। একটি শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানও যে যুগের অনুবেদনা ও উল্লাস ধারণ করে সম্প্রদায়বিশেষ থেকে সব মানুষের জন্য কল্যাণকর ও অংশগ্রহণমূলক উৎসবে পরিণত হতে পারে—দুর্গোৎসব তার বড় প্রমাণ। যাদের জীবনে উৎসব নেই, তাদের বাঁচা-মরা সমান। সম্প্রীতিময় এই উৎসবের আনন্দ প্রাণবন্যা জাগিয়ে তুলুক মানুষ থেকে মানুষে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা ও সাবেক জ্যাষ্ট সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।



