মিহির স্যার

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও দরিদ্র্যজনের খাদ্য নিরাপত্তা

ড: মিহির কুমার রায়: ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিয়ে সাহিত্য, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, মানব উন্নয়ন ইত্যাদি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে সাম্প্রতিককালে যা  প্রশংসনীয়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় বাংলাদেশে দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর এক-চতুর্থাংশেরও কম, অর্থাৎ প্রায় ৩.৫০ কোটির কাছাকাছি। এই লোকসংখ্যার মধ্যে যারা হত দরিদ্র তাদের সংখ্যা প্রায় ২ কোটির কিছু নিচে যা ক্রমাগত নিম্নমুখী বিশেষত: সরকার প্রণীত সামাজিকনিরাপত্তা কর্মসূচির কারণে যদিও বিগত দেড়  বছর আগে মহামারী করোনা (কভিড-১৯) এর কারনে এই অবস্থা কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। তবে এই শ্রেণীটির অবস্থা যেহেতু সংকটাপূর্ণ তাই খাদ্য  নিরাপত্তা বিষয়টি কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় অগ্রাধিকারভুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি বিশেষ দিক হলো অর্থনৈতিক মুক্তি যে ব্যবস্থায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবাই বেঁচে থাকবে নিজ নিজ সামর্থ্যের মহীমায় যা  ছিল আমাদের জাতির পিতার স্বপ্ন।

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের বিজয় বার্তা নিয়েই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছর শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের  সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বিশেষত, গত এক যুগে অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশের সাফল্য বেশ ঈর্ষণীয়। সরকারের পরিকল্পিত কৌশল গ্রহণের ফলে এ সময়ে দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয়  বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে বর্তমানে তা প্রায় ৩ হাজার ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯-এর  কারণে বিশ্বের প্রতিটি দেশের ন্যায় বাংলাদেশের অগ্রগতিও হঠাৎ হোঁচট খায়। ২০২০-এ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসে ৫ দশমিক ২৪  শতাংশে। কর্মসংস্থানেও দেখা যায় ঋণাত্মক প্রভাব। ফলে সাময়িক দারিদ্র্য যায় বেড়ে। যদিও সরকারের বেশকিছু দ্রুত সাহসী পদক্ষেপে  অতি অল্প দিনেই বাংলাদেশ ফের উন্নয়নের ট্র্যাকে উঠে আসতে সক্ষম হয়। 

সাম্প্রতিককালে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এক চরম রুপ নিয়েছে এবং বিশ্ব ব্যাংক আভাস দিয়েছে আগামী বছর বিশ্বে চরম খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। এই ধরনের একটি প্রেক্ষাপটে সরকার দারিদ্র্যদের খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে ১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে। হতদরিদ্রদের কাছে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করে তাদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করা এ কর্মসূচির লক্ষ্য। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে দেশে বিদ্যমান হত দরিদ্র মানুষের তুলনায় কর্মসূচির আওতাভুক্ত হত দরিদ্রদের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এ শ্রেণীভুক্ত অধিকাংশ মানুষ তথা পরিবার কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। তাছাড়া দেশের বাজারে সব শ্রেণীর চালের বাজারে মূল্যস্ফীতির যে উচ্চহার বিরাজ করছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি তা নিয়ন্ত্রণ করে চালের দাম নিম্নমুখী করতে কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিভিন্ন মহলে। এই ধরনের কর্মসূচী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিরন্য মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দিতে গত ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখে রংপুর বিভাগের চিলমারীতে ক্ষুধার্ত দারিদ্র্যদের মধ্যে প্রতি কেজি প্রতি পরিবারে মাত্র ১০ টাকা মূল্যে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল বিক্রির মাধ্যমে 'হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি' এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেছিলেন যার মাধ্যমে দেশের ৫০ লাখ পরিবার (প্রায় দু'কোটি মানুষ) বছরের পাঁচ মাস এই সুবিধা ভোগ করছিল যা সেই বছরে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং তা পরের বছরের মার্চ ও এপ্রিল হিসাবে সময়টি নির্ধারিত ছিল। স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হতদরিদ্র শনাক্ত করে কার্ড বিতরণের কাজ শুরু হয়েছিল এবং এই  প্রক্রিয়ায় প্রকৃত প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং নারীশ্রম নির্ভর পরিবারগুলোকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী দেশের  সরকার প্রধান যিনি কুড়িগ্রাম জেলার প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত দরিদ্র পরিবারগুলোকে নিয়েই কাজটি শুরু করেছিলেন। সেখানে জেলার ১  লাখ ২৫ হাজার ২৭৯টি পরিবার খাদ্যবান্ধব কার্ডের সুযোগ পেয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুরু হওয়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির গুরুত্ব  বেড়ে যায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়ার পর। গত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন,  সরকার ৫০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারকে বছরে কর্মাভাবকালীন সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল, অর্থাৎ পাঁচ মাসব্যাপী  ১৫ টাকা কেজি দরে পরিবার প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণপূর্বক খাদ্য সহায়তা প্রদান করবে। উল্লেখ্য, এর আগে এ কর্মসূচিতে  বিতরণকৃত চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ১০ টাকা। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাসরত নিম্ন আয়ের দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে হতদরিদ্র পরিবারগুলো এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। হতদরিদ্র  পরিবার বলতে ভূমিহীন, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, ভিক্ষুক ইত্যাদি পরিবারকে বোঝাবে। কর্মসূচি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে  রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ইউনিয়ন খাদ্যবান্ধব কমিটি, জাতীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে যথাক্রমে  প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা রেখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটি এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে  জেলা খাদ্যবান্ধব মনিটরিং কমিটি। ইউনিয়ন কমিটির কাজ হলো—১. ওয়ার্ড ভিত্তিক দারিদ্র্যের প্রকোপ, দুস্থতা ইত্যাদি  বিবেচনায় উপকারভোগী পরিবার নির্বাচন ও উপজেলা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন; ২. খাদ্যশস্য উত্তোলন থেকে  সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণ; ৩. ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টারে সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রকাশ। উপজেলা কমিটির দায়িত্বাবলির মধ্যে  রয়েছে— ৪. দারিদ্র্যের প্রকোপ, দুস্থতা বিবেচনা করে ইউনিয়নভিত্তিক সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বিভাজন; ৫. ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক  প্রণীত সুবিধাভোগীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন প্রদান; ৬. ডিলার নিয়োগ; ৭. খাদ্যশস্য বিতরণ কার্যক্রম পরিবীক্ষণ। জেলা কমিটির দায়িত্ব হলো ক. কর্মসূচির সার্বিক পরিবীক্ষণ; খ. কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্ভূত সমস্যা সমাধান।  

বর্তমানে সব শ্রেণীর চালের দামে উল্লম্ফন ঘটেছে এবং এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে এখন ১ কেজি মোটা চাল সর্বনিম্ন ৫০,  সর্বোচ্চ ৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০১৭ সালের এপ্রিলে সিলেটের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় সরকারি হিসাবে ১০ লাখ টন বোরো চাল নষ্ট হলে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫০-৫২ টাকায় উঠেছিল। এখানে উল্লেখ্য, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালুর দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫৪-৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।  বিশ্লেষনে দেখা যায় কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হার তলানিতে পৌঁছানোর প্রভাব পড়েছে শস্য উপখাতের প্রধান ফসল চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি  হারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির (২০২০ সালে ১.৩৭ শতাংশ) চেয়ে কম হারে বাড়ছে খাদ্যশস্য উৎপাদন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ বাংলাদেশে  চালের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আভাস দিয়েছে এবং তাদের মতে সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯৭ লাখ টনে। এ আভাস সঠিক হলে বোরো চালের উৎপাদন সরকারের ২ কোটি ৯ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ লাখ টন কম হবে। তারা আরও বলেছে, জুনে বন্যার কারণে আউশের উৎপাদনও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে। দীর্ঘ খরার কারণে চলতি আমন ফসল নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হলে দেশ চাল নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে, কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদনে ব্যয় হ্রাস, ধান উৎপাদনে ব্যয় কমলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হন। কিন্তু দেখা যায়, দেশে কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদন ব্যয় ক্রমে বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি সার ও ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে ধান উৎপাদন ব্যয় নতুন করে বেড়ে যাবে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীর্ঘ খরা ও অনাবৃষ্টি, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা: বলতে দ্বিধা নেই, দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত চাল কল মালিকরা। সরকার দেশে উৎপাদিত ধান-চালের খুব সামান্য পরিমাণ সংগ্রহ করায় ধান (বোরো ও আমন) কাটা-মাড়ার মৌসুমে চাল কল মালিকরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে কম দামে প্রচুর পরিমাণে ধান কিনে তা চালে রূপান্তর করে। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। এর ফলে দারিদ্র্য সীমার সামান্য ওপর থাকা মানুষ  দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে আসে, অর্থাৎ তারা দরিদ্র শ্রেণীভুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে দরিদ্ররা অতিদরিদ্রদের কাতারভুক্ত হয়। করোনাকালীন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক নতুন করে হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস)  প্রণীত না হওয়ায় জানা যাচ্ছে না দেশে বর্তমানে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ও শতকরা হার কত। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ৫০ লাখ পরিবারে জনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে দুই কোটি (প্রতি পরিবারে চার জন হিসাবে)। ৫০ লাখ পরিবারকে বছরে কর্মাভাবকালীন  সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল, অর্থাৎ পাঁচ মাসব্যাপী ১৫ টাকা কেজি দরে পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণ  ওই সময়কালে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত করবে। তবে বছরের বাকি সাত মাস তাদের খাদ্য নিরাপত্তা যে চ্যালেঞ্জের  সম্মুখীন হবে তা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়। ১ সেপ্টেম্বর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালুর দিনে সরকার সীমিত আকারে ও এমএস কর্মসূচিও চালু করে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএসের মাধ্যমে খাদ্য মন্ত্রণালয়  সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়কালে সাশ্রয়ী মূল্যে ৭ লাখ ৬৫ হাজার টন চাল নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

উপরে বর্ণিত ফ্যাক্টরগুলো এবং দেশে বছরে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টন চালের চাহিদার বিপরীতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বিতরণ করা মাত্র ৭.৬৫ লাখ টন চাল বাজারে পণ্যটির আকাশছোঁয়া দাম হ্রাসে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। গত ২৮ আগস্ট সরকার চাল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কর ১০ শতাংশ থেকে ৫  শতাংশে নির্ধারণ করায় এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস চালু হওয়ায় চালের দাম, বিশেষ করে মোটা চালের দাম কেজিতে ৪-৫ টাকা হ্রাস পেতে পারে। 

এরই মধ্যে দেশটি সামাজিক ও আর্থিক খাতে উন্নয়নের জন্য বিশ্ব পরিসরে রোল মডেল হওয়ার প্রশংসা কুড়িয়েছে স্বীকৃতির মাধ্যমে। তাই এবারকার ১৫ টাকা প্রতি কেজি চালের দারিদ্র্যবান্ধব কর্মসূচিটি সফলতা লাভ করলে আরও একটি আন্তর্জাতিক কৃতিত্বের  দাবিদার হতে পারবে এই সরকার। এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রথমত, একটি দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, যা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক  দলের তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে রয়েছে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত অনুভূতিকে শক্তিতে  রূপান্তরিত করে মানব কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে এবং অতীতের অনাদর্শিক পথ পরিহার করতে হবে। কারণ এর সঙ্গে  সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টি জড়িত রয়েছে এবং রাজনীতি হোক কল্যাণমুখী অন্তরমুখী নয়; দ্বিতীয়ত, এটি একটি দরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব সরকারি কর্মসূচি যার সঙ্গে খাদ্য, কৃষি, জন প্রশাসন ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ জড়িত। এই  কর্মসূচির মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক সমন্বয়কারী হিসাবে রয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিবৃন্দ ও সরকারি বেসরকারি প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছে খাদ্য বিভাগ কর্তৃক নিয়োজিত ডিলারগণ ও উপজেলার বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাবৃন্দ; তৃতীয়ত, পৃথিবী বদলাচ্ছে দ্রুত। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলাচ্ছে মানব প্রেম, নৈতিকতা ও আদর্শবোধ। কিন্তু তারতম্য এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

আজ  থেকে একশ' বছর আগে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সব বাণী দিয়েছিল সেগুলো এখনও জীবন্ত বলে মনে হয়। উনিশশ'  তিপ্পান্ন সালে উত্তম-শর্মিলা অভিনীত চলচ্চিত্র 'আনন্দ আশ্রম'-এর একটি গান 'পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে, তুমি আমি একই  আছি, দু'জনে যা ছিলাম আগে।' এখনও আমাদের মনে দাগ কাটে। বাজার অর্থনীতি আমাদের সব কেড়ে নিলেও প্রেম-প্রীতিটুকু আমাদের দিয়ে গেলেই পারত। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তা পারেনি যার ফলে আমরা এখনও বেঁচে আছি। যারা রাজনীতি করে তারা দেশের  মাটি ও মানুষকে ভালোবেসেই সেই কাজটি করে তার প্রমাণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং তারই আবিষ্কৃত কর্মসূচি দুঃখী মানুষের ক্ষুধা  নিবারণ করবে সেটাইতো প্রত্যাশা। জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। তাই সেই ধারণাটিকে বুকে বেঁধে সবাই যদি  কাজ করে তাহলে অপশক্তি আর দাঁড়াতে পারবে না; চতুর্থত, আমাদের দেশে গরিবের হক কেড়ে নেয়ার উদাহরণ অনেক  থাকলেও পাশাপাশি অনেক সফল উদ্যোগও রয়েছে সরকারি পর্যায়ে, যেমন বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, প্রতিবন্ধীদের ভাতা,  একটি বাড়ি একটি খামার কর্মসূচি ইত্যাদি। সেই অভিজ্ঞতায় আলোকিত হয়ে স্থানীয় প্রশাসন, কর্মসূচি বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, খাদ্য ব্যবসায়ী (ডিলার) সবাইকে অভিযোগের খেলা পরিহার করে ক্ষুধার্তরা যাতে সহজে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে তার  আদর্শিক দিকটি নিয়ে এগুতে হবে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীবিক্ষণের ব্যবস্থা রুটিনমাফিক করতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কেইসভিত্তিক অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে সেগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। তাহলেই রাজনৈতিক দর্শনের সুফল সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে নেত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। কারণ সামাজিক অঙ্গনে এখন যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার সর্বাগ্রে রয়েছে দারিদ্র্য মুক্তি ও ক্ষুধা মুক্ত বাংলাদেশ।

লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি ও জৈষ্ঠ্য সহ সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি, ঢাকা।

 

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//


Comment As:

Comment (0)