সুন্দরবনে বাঘ শুমারী: কিছু প্রসঙ্গ
ড: মিহির কুমার রায়ঃ সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলীয় তিনটি জেলায় ও পশ্চিম বঙ্গের একটি জেলায় বিস্তৃত যা বাংলাদেশের বলেস্বর নদী ও ভারতের হুগলী নদী দ্বারা বিস্তৃত। জাতীসংঘের ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে সুন্দরবনকে বিভক্ত করেছেন যথাক্রমে, সুন্দরবন পশ্চিম (বাংলাদেশ), সুন্দরবন দক্ষিন (বাংলাদেশ), সুন্দরবন পূর্ব (বাংলাদেশ) এবং সুন্দরবন নর্থ পার্ক (ভারত)। সুন্দরবনের মোট আয়তন ৩৯০০ স্কয়ার মাইল যেখানে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগে রয়েছে ২৩২৩ স্কয়ার মাইল এবং ভারতের পশ্চিম বঙ্গের দক্ষিণ-উত্তর চব্বিশ পরগনায় রয়েছে ১৬৪০ স্কয়ার মাইল এলাকা। সুন্দরবন এলাকায় ৪৫৩ প্রজাতির গাছ ও প্রাণী কূলের বাস তার মধ্যে সুন্দরী গাছ ও প্রাণীর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের অহংঙ্কার।
তারপরও জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রতিকূলতার কারনে প্রাণীকূল বিশেষত: রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন বিপন্নের পথে এবং এখানে উল্লেখ্য, বাঘ সারা বিশ্বে একটি বিপন্ন প্রাণী। তথ্য মতে, বর্তমানে বিশ্বের ১৩টি দেশে ৩ হাজার ৮৪০টি বাঘ প্রকৃতিতে টিকে আছে, তার মধ্যে সর্বশেষ ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সুন্দরবনের বাঘ আছে ১১৪টি, ২০১৫ সালের জরিপে ১০৬টি ও ২০০৪ সালের জরিপে ৪০৪টি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
সময় সময় সুন্দরবন নিয়ে অনেক দেশী-বিদেশী সংস্থা জরীপ করেছে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে, যার মধ্যে একটি বহুল পরিচিত পদ্ধতি হলো ক্যমেরা সেটিং এর মাধ্যমে বাঘের অস্তিত্ব সনাক্ত করেন। বাংলাদেশের বন বিভাগ ২০১৮ সালে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন এলাকায় ক্যামেরা বসায় ২৩৯টি পয়েন্টে এবং ২৪৯ দিনে ২,৫০০টি টাইগারের ইমেজ সংগ্রহ করে। এতে উঠে আসে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির একটি বড় প্রক্রিয়া হলো বাঘ-বাঘিনীর সংগম যা অনেকাংশে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে এবং মেইল-ফিমেল অনুপাত হলো ৫:১ পশ্চিম সুন্দরবনে এবং ১:১০ পূর্ব সুন্দরবনে। এই অবস্থা বিবেচনায় রেখে গত ২৩ মার্চ ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ প্রকল্পে দুটি অংশ রয়েছে- একটি হলো বাঘ গণনা ও অন্যটি বাঘ সংরক্ষণ। বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০০৯-২০১৭), ২০১০ সালের বিশ্ব বাঘ সম্মেলনের অঙ্গীকার, দ্বিতীয় টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৬-২০২৭) ও গ্লোবাল টাইগার ফোরামের সিদ্ধান্তের আলোকে দেশে বাঘের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ এবং সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ ও এর সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। পরিকল্পনা কমিশন থেকে টাকা ছাড়ের বিষয়টি অনুমোদনের পর বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু প্রক্রিয়া ছিল। সেই সব সম্পন্ন করে বাঘ গণনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সম্প্রতি সুন্দরবনে বার বার বাঘ দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে বনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। তবে গণনা সম্পন্ন হলে সঠিক সংখ্যা বলা যাবে। সুন্দরনের জীব বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে বাঘের গুরুত্ব সব থেকে বেশি। এই প্রকল্পটি মূলত বাঘের বংশ বৃদ্ধির জন্য নেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে সুন্দরবনে ‘বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের’ আওতায় বাঘ গণণা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে এ গণনার ফলাফল প্রকাশ করা হবে। সুন্দরবনের কালাবগি ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন এলাকায় থেকে এ গননা শুরু হয়েছে। বন বিভাগের, বাঘ গণনার জন্য প্রথমে নদী-খাল জরিপ করে ও বাঘের পায়ের ছাপ দেখে এলাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘের ছবি তুলে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। এ জন্য ৩ কোটি ২৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকার অনুমোদন হয়েছে। এরি মধ্যে একটি দল বনে নদী-খাল জরিপের কাজ শুরু করেছে। এছাড়া আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। সুন্দরবনের প্রায় ৮০০টি গ্রিডে ক্যামেরা বসিয়ে বাঘসহ অন্যান্য প্রাণীর ছবি তোলা হবে। পরে তা প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে। আগামী তিন মাস এই ধরনের জরিপ ও ক্যামেরা ট্র্যাপিং চলবে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের নভেম্বরে আবারও একইভাবে জরিপ ও ক্যামেরা ট্র্যাপিং করা হবে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসের দিকে এর ফলাফল জানা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মানুষ-বাঘ দ্বন্ধ নিরসনে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের ৩৪০ জন সদস্য ও চারটি রেঞ্জের কমিউনিটি প্যাট্রোল গ্রুপের ১৮৫ জন সদস্যকে প্রশিক্ষণ প্রদান, তাদের পোশাক সরবরাহ ও প্রতি মাসে বন কর্মীদের সঙ্গে মাসিক সভা করার কাজ চলছে।
এ প্রকল্পের বাঘ সংরক্ষণ অংশে বাঘের বংশ বৃদ্ধির জন্য পুরুষ ও নারী বাঘকে কাছাকাছি রাখতে বাঘ হস্তান্তর, তাদের বিচরণ এলাকা জানার জন্য দুটি বাঘের স্যাটেলাইট সংযুক্তি ও মনিটরিং করা, বাঘের পরজীবীর সংক্রমণ ও অন্যান্য ব্যাধি এবং মাত্রা নিণয় উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন, বাঘ ও বাঘের শিকার প্রাণী ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয়ের জন্য সুন্দরবনে ১২টি মাটির উচুঁ কিল্লা স্থাপন করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। এ্খন একটি প্রসঙ্গ বার বার আসছে যে পুর্বের জরীপের ফলাফলের ক্রমাবনতি এবং এতেই বুঝা যায় বাঘের বংশ বৃদ্ধি ও পরিবেশ অনুকূলে নয়। সরকার যে কোটি কোটি জরীপের জন্য খরচ করছে বন বিভাগের মাধ্যমে তা কতটুকু ফলদায়ক হবে? তার প্রসংগটি হলো- এই ধরনের একটি টেকনিক্যাল কাজে বন বিভাগের দক্ষ জনবল আছে কি? প্রায়শই একটি অভিযোগ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে যে তাদের অসাদুতার কারনে দেশের বনবিভাগ উজার হয়ে গেছে, সংরক্ষিত বনভূমিগুলো যেমন মধূপূর ও ভাওয়ালের গড় হুমকিতে পড়েছে, তারপরও এ ধরনের বাঘ গণনা প্রকল্প কি কেবলই সরকারের অর্থের অপচয় নাকি বাঘের বংশ বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখবে- সে প্রশ্নটি রয়েই গেল। তার চেয়ে বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি বিশেষ জরুরী, গনণার নামে কোটি টাকা খরচ করলেই বাঘের সংখ্যা বেড়ে যাবে তা কিভাবে আশা করা যায়-এ প্রশ্নটিও রইল।
লেখক: গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//



