ড. ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণ তত্ত্ব: রাজনৈতিক অর্থনীতি
ড: মিহির কুমার রায়: প্রফেসর ড. ইউনূস সাম্প্রতিককালে আলোচনায় এসেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিষেষত: একটি সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ২০২৩ সালের প্রথম দিকে ওয়াশিংটন পোস্টে ড. ইউনূস সম্পর্কে ৪০ জন বিশ্ব নেতা কর্তৃক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া খোলা চিঠি প্রকাশের মাধ্যমে, যা পরবর্তিতে বাংলাদেশের একটি ইংরেজি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই চল্লিশ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন- যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মেরির বিনসন, সাবেক মার্কিনি সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডির পুত্র টেড কেনেডি, অভিনেত্রী শ্যারন স্টোন প্রমুখ। তারা তাদের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজের নেতা এবং সমাজসেবী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্বোধন করে দেয়া বিবৃতি বা খোলা চিঠিতে ড. ইউনূসের অবদানকে সমর্থন ও স্বীকৃতি দিয়ে তাকে বিভিন্ন তদন্তের আওতায় এনে হয়রানি না করতে অনুরোধ করা হয়েছে। সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর সাথে কোন কারণে দূরত্ব সৃষ্টি হলে তা নিরসনে উক্ত চল্লিশজন বিবৃতিদাতা তাদের বক্তব্য প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ করে পত্রিকায় প্রকাশনা করে সরাসরি শেখ হাসিনার কাছে পাঠাতে পারতেন। এখানেও রাজনীতির খেলা। এই খেলাটি খেলানো হয়েছে আমেরিকান কৌশলে, যে কৌশলে রাশিয়া প্রলুব্ধ হয়েছিল ইউক্রেন আক্রমণ করতে। তাই এই খেলা ড. ইউনূস এবং শেখ হাসিনার বিরাজমান সম্পর্ককে আরও তলানিতে নামিয়ে দিতে পারে। ইতিহাসে ইউএস প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং ইউএস কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল পাওয়া যে ৭ জন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন তাদের মধ্যে ড. ইউনূস অন্যতম বলে বিবৃতি দাতারা ড. ইউনূসের গুরুত্ব বোঝার ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনাকে। এই চিঠিতে ড. ইউনূসকে বিশেষ করে অতি দরিদ্র ও সবচেয়ে বিপদাপন্ন মানুষদের জন্য তার অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৯০ লাখের কথা বলা হয়েছে। আবার ২০২২ সালে প্রফেসর ড. ইউনূস সম্পর্কে বাংলাদেশের দ্য বিজনেস পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের শিরোনাম- ‘প্রফেসর ড. ইউনূস: দ্য মেটেওরিক ফল অব অ্যা নোবেল লরিয়েট’ অর্থাৎ ‘অধ্যাপক ড. ইউনূস: নোবেল বিজয়ীর উল্কাপতন’ এই নামে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালের শেষের দিকে। এখানে আরও উল্লেখ্য যে ২০১০ সালে টম হেইনম্যানের একটি ডকুমেন্টারি ‘ক্ষুদ্র ঋণে ধরা’ (কট ইন মাইক্রো ক্রেডিট)-তে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে নরওয়েজিয়ান এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন (নোরাড) বাংলাদেশে দরিদ্রদের আবাসন সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে ব্যাংককে দেয়া ঋণের জন্য প্রদান করা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সরিয়ে দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর পরপরি বিষয়টি সরকারের নজরে আসে এবং অর্থ মন্ত্রনালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে খোজ খবর নিতে শুরু করে এবং প্রাপ্ত তথ্যভিত্তিতে জানা যায় সরকারের বিশেষায়িত ব্যাংক হিসাবে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চাকুরির সর্বোচ্চ বয়স সীমা ৬০ বছর হলেও তিনি ৭০ বছর বয়সের অধিকারী হয়েও স্বপদে বহাল রয়েছেন যা সরকারী চাকুরীর পরিপন্থি। এর পরপরি বিষয়টি তাকে অবহিত করা হলে তিনি তার স্বপদ থেকে পদত্যাগ করতে অসম্মতি জানান। সরকার তাকে ‘উপদেষ্টা ইমেরিটাস’ হিসেবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়, কিন্তু তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন যা অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আইনি লড়াইয়ে হেরে যান তিনি। সেখান থেকেই সরকারের সাথে তার বিরোধ চলতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে সেই সময় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হীলারি ক্লিনটনকে দিয়ে ড. ইউনুস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করান এবং সরকারপ্রধান এতে আরও ক্ষীপ্ত হয়ে উঠেন যা তার বিভিন্ন বক্তৃতায় শোনা যায়। তারপর ড. ইউনূসকে নিয়ে পর্যায়ক্রমে অভিযোগ আসতে শুরু করে যেমন পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিল করার জন্য বিশ্বব্যাংককে প্রভাবিত করা থেকে শুরু করে কর ফাঁকি, দাতা তহবিলের অবৈধ স্থানান্তর, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিদেশ ভ্রমণ বিধি লঙ্গন প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশে তার বিতর্কিত ভূমিকার ফলে তার খ্যাতি উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এখানে উল্লেখ্য ২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর নরওয়ের নোবেল পিস প্রাইজ কমিটি যখন বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খ্যাত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ঘোষণা করে তখন বাংলাদেশব্যাপী এক আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের ঢেউ আছড়ে পড়ে। অসংখ্য কর্তাব্যক্তি ড. ইউনূসকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে যান তার কর্মস্থল এবং বাসভবনে। তিনিও ছিলেন সেদিন ভীষণভাবে উৎফুল্ল। বাংলাদেশের মানুষ বিদেশীদের নোবেল বিজয়ের কথা শুনে শুনে বড় হয়েছেন যদিও ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম বাঙালি কবি যিনি এই পুরস্কার লাভ করেছিলেন তার ‘গীতাঞ্জলি’কাব্য গ্রন্থের জন্য। তখন তিনি ভারতবাসী হিসেবে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় বাংলাদেশের মানুষও অনেকটা আনন্দ অনুভব করেছিল যদিও আমজনতা প্রতিবছর সুইডেন প্রদত্ত একাডেমিক নোবেল এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে প্রফেসর ইউনূসকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য বাংলাদেশে সম্মান করা হয়েছিল, যদিও তার সংগঠনটি রহস্যজনক সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে অসংখ্য অনুসন্ধান ও অভিযোগের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।
সম্প্রতি বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গ্রামীণ টেলিকম (জিটি) এবং এর পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ৩ হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত লভ্যাংশের ৫ শতাংশ অপব্যবহার; আইনজীবীদের ফি এবং শ্রমিকদের বেতন থেকে অন্যান্য চার্জ হিসাবে ৬ শতাংশ অবৈধভাবে কাটা; কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিল থেকে ৪৫.৫২ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ এবং কোম্পানি থেকে ২ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা অবৈধভাবে পাচার করা। নোবেল বিজয়ী এবং তার সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তদন্ত নতুন নয়, ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শ্রম আইন লঙ্ঘনের জন্য ড. ইউনূস এবং অন্য তিনজনের বিরুদ্ধে কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ কর্তৃক শ্রম আইনের ধারা ৪, ৭, ৮, ১১৭ এবং ২৩৪-এর অধীনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের শ্রম আইন লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন যে তার প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শ্রমআইন ভঙ্গ করেছে। এছাড়া সম্প্রতি ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে একটি চমকপ্রদ অভিযোগ উঠেছে যে তিনি তার বিরুদ্ধে গ্রামীণ টেলিকম ইউনিয়ন শ্রমিক ও কর্মচারীদের দায়ের করা ১১০টি মামলা ২৫০ মিলিয়ন টাকায় বেআইনিভাবে নিষ্পত্তি করেছেন। ২০১৫ সালেও তিনি বিতর্কিত হয়েছিলেন যখন বাংলাদেশের রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ১.৫১ মিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ কর পরিশোধ না করার জন্য তাকে তলব করেছিল। এছাডা ড. ইউনুস পরিচালিত সকল প্রতিষ্ঠানে মধ্যযুগীয় কায়দায় শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনসহ শ্রমিক কর্মচারীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ তাদের উপরে নানা ধরনের নিপীড়নমূলক কর্মকান্ড চালানো হয়েছে। তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমুহে রয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা, প্রতিনিয়ত আইনের লঙ্ঘন এবং নানা ধরনের তুঘলকিয়ানা।
আমাদের বিশ্বাস তার এই ভয়াবহ অর্থ পাচার, দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধ এবং শ্রমিক অধিকারমূলক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য প্রকাশিত হলে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির মত তারও নোবেল পুরস্কার বাতিলের দাবি উত্থাপিত হবে সারা পৃথিবীতে। সামাজিক ব্যবসার নামে তিনি দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন এবং সেই টাকা দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত নামে বিভিন্ন দেশে সম্পদ ক্রয়সহ নানা রমরমা ব্যবসা করছেন। এর কিছু অংশ বিদেশে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজে লবিস্টের পিছনে ঢেলেছেন। এইসব তথ্য প্রকাশিত হলে সবাই শান্তিতে নোবেল পাওযা এই ব্যক্তির প্রতি ধিক্কার জানাবে।
এথন আসা যাক ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে গ্রামীণ টেলিকম তথা গ্রামীণফোনের লাইসেন্স গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। লাইসেন্স গ্রহণের পূর্বে তিনি সরকারের কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তিনি গ্রামীণ ফোনের লাইসেন্স নিতে চাচ্ছেন। অঙ্গীকার করেছিলেন কোন মুনাফার জন্য নয় বরং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে সেবা প্রদানই হবে এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য। মূলত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীন টেলিকমের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। লাইসেন্স গ্রহণকালে দেশের দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের অঙ্গীকার করলেও ড. ইউনুস শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যা যা করণীয় তার প্রতিটিই করেছেন। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিযে গ্রামীণফোনের অধিকাংশ শেয়ার বিদেশী কোম্পানীর হাতে তুলে দিয়েছেন। অনেকেই মনে করেন এর বিনিময়েই পরবর্তীতে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ড. ইউনুসের কারণেই প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা হিসেবে নিযে যাচ্ছে নরওয়েজিয়ান কোম্পানি টেলিনর। গ্রামীণ টেলিকম বর্তমানে গ্রামীণফোনের ৩৪.২০ শতাংশ শেয়ারের অংশীদার যার মাধ্যমে গ্রামীন টেলিকম প্রতিবছর গ্রামীণফোন থেকে হাজার কোটি টাকার উপর ডিভিডেন্ড পায়। কোম্পানি আইনের ২৮ ধারায় গঠিত এই অলাভজনক কোম্পানির কোন শেয়ার মূলধন নেই, কোন ব্যক্তি মালিকানা নেই। আইন অনুযায়ী এর কোন ডিভিডেন্ট অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। অথচ ড. ইউনুস প্রতিবছর গ্রামীণ টেলিকমের হাজার কোটি টাকার উপর ডিভিডেন্ট সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কয়েক হাত ঘুরিয়ে সামাজিক ব্যবসার নামে বিদেশে পাচার করে আত্মসাৎ করছেন।
এখন আসা যাক ড. ইউনূসের রাজনৈতিক অভিলাস নিয়ে কিছু কথা যেমন ২০০৭ সালে যখন একটি তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসন বাংলাদেশি সেনাবাহিনী দ্বারা সমর্থিত হয়েছিল, তখন ড. ইউনূসকে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে তার কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল এবং একি বছরের ১১ই ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূস দেশের রাজনীতির ‘সংস্কার’ করার জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য দেশবাসীর সমর্থন চেয়েছিলেন কিন্তু জনগণ তার দলকে প্রতিহত করেছিল। ড. ইউনূস শান্তিত নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার কোন ভূমিকা দেখা যায়নি। ক্ষুদ্র ঋণ বা অর্থনীতির ওপর তার নোবেল প্রাপ্তি অধিকতর যুক্তিযুক্ত হতো। একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায় ড. ইউনুস ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে সেই সময় দেশে ও বিদেশে অনেক স্বপ্নের কথা বলতেন, দারিদ্র্য বিমোচনের উপায় হিসেবেও বলতেন, তিনি এও দাবি করতেন যে দারিদ্র্যকে একসময় মিউজিয়ামে খুঁজে পাওয়া যাবে, তার এসব কথায় অনেকেই স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু অনেকেই গ্রামীণ ব্যাংকের তিন দশকের কোনো সাফল্য না দেখার চিত্র পত্রপত্রিকায় তুলে ধরতেন। অনেক গবেষনা বলছে ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে দারিদ্র বিমোচন হবে তার কোন সাইন্টিফিক ভিত্তি নেই। আর গ্রামীন ব্যাংক ক্ষুদ্র ঋণ মডেল কোন নূতন উদ্ভাবনও নয় যা বিভিন্ন ধারনা থেকে নেয়া একটি প্রয়াশ যা তিনি পৃথিবীব্যাপী বিপণন করেছেন। এক কালের স্বনির্ভর ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসুচি কিংবা কুমিল্লা সমবায় ঋণ কর্মসূচী গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ মডেলের উপকরন যোগিয়েছে যা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। ড. ইউনূসের সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে কাজ করার একটি অভিলাস রয়েছে যা আমরা দেখি সত্তরের দশকের শেষ দিকে তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট জিয়ায়ুর রহমান যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন তিনি দেশের ৬৮ হাজার গ্রামে স্বনীর্ভর গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার মূল কারীগর ছিলেন ড. ইউনুস, তিনি কাউকে কিছু দিতে শেখেননি, শুধুই নিতে শিখেছেন যা তার কার্যকলাপ থেকে পাওয়া যায়। তিনি ক্ষমতাবিলাসী তথা রাষ্ঠীয় ক্ষমতায় যেতে চান তার প্রমাণ পাওয়া যায় যেমন ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে দেখা যায় যদিও এই প্রস্তাব তার কাছেও গিয়েছিল এবং তিনি তা গ্রহন করেন নি। আরো জানা গেল ১/১১-এর নেপথ্যের কুশীলবদের তিনি একজন সমঝদার ছিলেন। মানুষের আশাহত হওয়ার মতোই তিনি একের পর এক কাজ করতে থাকেন। জাতীয় কোনো সংকটে তিনি অতীতেও মানুষের পাশে দাঁড়াননি, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সময় দেশে যে রাজনৈতিক সংকট চলছিল তা নিরসনেও তিনি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি, তিনি কখনো বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে যান নি, ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে গিয়েছেন বলেও শোনা যায়নি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে অথবা তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতেও দেখা যায়নি, তিনি একজন নিরব ব্যক্তি। তবে ড. ইউনূস কিংবা নেপথ্যের আরো বড় কোনো কুশীলব আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করার পাঁয়তারা থেকেই এমনটি করে থাকতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। ড. ইউনূস দেশে রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে নতুন করে কোনো টার্ন সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে কেউ কেউ দড়িতে বেঁধে সরকার টেনে ফেলারও হুমকি দিচ্ছেন। অঙ্কের জটিলতা কারো কাছে দুর্বোধ্য হলেও সূত্র যাদের জানা তারা ভালো করেই বুঝতে পারেন এর উৎস কোথা থেকে, পরিণতি কোথায় যাবে। তবে ড. ইউনূস নিজেকে ক্রমাগত নামাতে নামাতে অবস্থান নেয়ার খুব বেশি আর বাকি কিছু রাখেননি। তিনি আসলে আমাদেরই এখন বিদেশে হাসির পাত্র করতে নেমেছেন বলে মনে হয়। তবে বাংলাদেশের জনগণ তাদের অবস্থানেই আছেন, ড. ইউনূসের অস্থিরতা সবাইকে বিস্মিত ও হতবাকই করেছে।
শুধু ড. ইউনূস নন, পৃথিবীর অনেক নোবেল বিজয়ী নিজ দেশে এবং দেশের বাইরে নানা কারণে সমালোচিত হয়েছেন। ড. ইউনূসের মতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক না হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী পাকিস্তানের আবদুস সালামকে শুধু ধর্মীয় কারণে নাজেহাল করা হয়েছে, মৃত্যুর পরও নিজ দেশের সরকার ও জনগণের আক্রোশ থেকে রক্ষা পাননি তিনি। তার সমাধির এপিটাফে প্রথমে লেখাছিল ‘প্রথম মুসলিম নোবেল বিজয়ী’, পরে পাকিস্তান সরকার ‘মুসলিম’ শব্দটি মুছে ফেলে। জীবিতকালে নিপীড়নের শিকার হওয়া সত্বেও দেশের প্রতি তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তাকে ব্রিটিশ ও ইতালিয়ান নাগরিকত্বের অফার দেয়া হলেও মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর কবিকে, কবির কবিতাকে এবং সুইডিশ একাডেমিকে আক্রমণ শুরু করা হয়। শান্তিতে যারা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের যোগ্যতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। বারেক ওবামার শাসনামলে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত থাকা সত্বেও নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কারের জন্য তাকে নির্বাচন করে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে বাস্তচ্যুত ও গুলি করে হত্যা করার জন্য দায়ী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন প্যারেজকেও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মায়ানমারের অং সান সূচির নোবেল পুরস্কার ফেরত নেওয়ার আবেদন করেছেন বহু লোক; কারণ রোহিঙ্গা গণহত্যা ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্গনের অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত। কম্বোডিয়ায় আমেরিকার বোমা বর্ষণ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সামরিক শাসনের সমর্থনকারী যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারও ১৯৭৩ সালে শান্তিতে নোবেল পান।
ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যা দেশের জন্য গর্বের হলেও দেশের অভ্যন্তরে তাকে নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তার অবসান কবে হবে তা এই মূহূর্তে বলা যায় না। এটি বর্তমান সরকারের শেষ বছর এবং সব ঠিক থাকলে আগামী জানুয়ারীতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বিধায় সকল দ্বন্দের নিরশন হওয়া উচিত গনতন্ত্রের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। গ্রামীন ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ মডেল সারা র্পৃথিবিব্যাপী সমাদৃত হয়েছে যা সরকারের জন্য অবিশ্যি গর্বের বিষয়, কারন গ্রামীন ব্যাংক সরকারের মালিকানাধীন একটি ব্যাংক। তাই সকল ভেদাবেধ ভূলে গিয়ে আসুন দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই এই আশা রইল।
লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//



