রমজানে ঈদের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি
ড: মিহির কুমার রায়: বিশ্বের সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বড় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর, আর এই ঈদকে ঘিরে ধর্মপ্রাণ মানুষদের থাকে নানান পরিকল্পনা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ঈদের আনন্দ সবচেয়ে বেশি। ঈদের চাঁদ দেখা মাত্রই শুরু হয়ে যায় আনন্দ উপভোগ, ঘরে ঘরে চলে বাহারি খাবার রান্নার ধুম, ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ, উল্লাস আর ফুর্তি। ঈদ মানে নতুন পোশাক, ঈদের নামাজ, নামাজ শেষে কোলাকুলি, আত্মীয়দের বাসায় ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়া, মাস্তি মজা আর অন্তরঙ্গদের বুকে জড়িয়ে মোবাইলের ফ্রেমে বন্দী করা অসংখ্য স্থির চিত্র। ঈদের আগে রাত জেগে শপিং তো তরুণদের প্রত্যেকবারের রুটিন। মুরব্বিদের পা ছুঁয়ে দোয়া, ভালবাসা আর বকশিশ আদায় করা ছাড়া তো ঈদ উদযাপন অসম্পুর্ণই থেকে যায়।
রমজানের অর্থনীতির রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যেমন- এ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ে, অনেক ভোজ্য পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যায়, ফলে এসব পণ্যের উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণন বৃদ্ধি পায়, ইফতার বাজার বসে রোজার মাসে, অনেকের সাময়িক কর্মসংস্থান হয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চাঙ্গা হয়, নতুন অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যবসা রোজার মাসে বহু গুণে বেড়ে যায়, তাদের পুঁজি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মচারীদের বেতনসহ সব কিছু এ মাসের ব্যবসা দিয়ে চলে। রোজার মাসে অর্থের প্রবাহ ব্যাপকভাবে বাড়ে, ব্যাংকের অলস অর্থ থেকে কিছু অর্থ গ্রাহকদের হাতে এসে সক্রিয় হয়, তা থেকে দান-সদকা, হাদিয়া, জাকাত-ফেতরার মাধ্যমে কিছু অর্থ গরিবের কাছে আসে, পরবর্তী সময়ে তা আবার বাজারে যায়। বাজার থেকে ব্যবসায়ীর মূলধন হয় কিংবা ফের ব্যাংকে জমা পড়ে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যে অর্থের প্রয়োজন, তার বড় একটা অংশ রোজার মাসেই আসে। রোজা শেষে আসে ঈদ। সাধ্যমতো নতুন পোশাক ও প্রসাধনী ক্রয়ের চেষ্টা সবারই থাকে; এর প্রভাবে অর্থনীতিতে গতি আসে, পরিবহন খাতেও ব্যস্ততা বেড়ে যায়, ঈদ উপলক্ষে নগরবাসী গ্রামে ছোটে, রেল, বাস, লঞ্চের যাত্রী বহুগুণে বেড়ে যায়, ঈদে অনেকে পর্যটনমুখী হয় যার ফলে অর্থনীতির সচলতা বাড়ে। সমাজে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে রোজার ভূমিকা অপরিসীম। কারন এ মাসে গরিব-দুঃখীদের প্রতি সম্পদশালীদের সহানুভূতি জাগে, ব্যাপকভাবে দানের হাত সম্প্রসারিত হয়, রোজাদার ধনী ব্যক্তি রমজান মাসে জাকাত প্রদান এবং মুক্ত হস্তে দান-খয়রাত ও সদকা আদায় করেন, যা সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। রমজানে ধনী ব্যক্তি বেশি পরিমাণে ধন-সম্পদ জমিয়ে রাখতে পারেন না, ফলে পণ্যের সরবরাহ বাড়ে।
রমজানের অর্থনীতি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা নিয়ে যে বিষয়টি দেখা যায় তা সহজেই অনুমেয় বলে বিবেচিত। দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা অর্জনের আশায় এ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে কোন পণ্য রমজান মাসে বেশি ব্যবহার হবে, রোজাদাররা কোন পণ্যটি দাম বাড়লেও কিনতে চাইবে কিংবা তারা রোজার অনেক আগে থেকেই খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইত্যাদি। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, রমজান মাসটা যেন খাদ্যোৎসবের মাস যেখানে রোজাদাররা বেশি বেশি খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত থাকে, দাম যতই বাড়ুক না কেন, বেশি দাম দিয়ে হলেও তা কিনতে হবে, ইফতার বা সেহরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার না-থাকলে রোজা যেন পূর্ণতা পায় না। কেউ কেউ রমজান মাসের কথা চিন্তা করে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ঘরে মজুদ করতে থাকে। ঈদ সামনে রেখে শুরু হয় কেনাকাটার ধুম, রমজানের প্রকৃত ফজিলত নিয়ে তেমনভাবে ভাবনার বিষয় কমই দেখা যায়। নিম্ন আয়ের মানুষ এ বছরের মাসটিতে কীভাবে রোজা রাখবে বা উচ্চমূল্য দিয়ে দ্রব্যাদি কিনে কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করবে; এটি নিয়ে দেশের অধিকাংশ বিত্তশালীদের কম ভাবতে দেখা যায়। রমজান এলে এ দেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের প্রস্তুতি তৈরি হয়, তারা এ পবিত্র মাসে আধ্যাত্মিকভাবে পুণ্য অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নেন, আবার কেউ প্রস্তুতি নেন সেহরি-ইফতার নানা পরিকল্পনায় উদ্যাপনের জন্য। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধসহ সব সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ী যেখানে বিশেষ ছাড় দিয়ে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে ধর্মীয় পর্বের উপহার নিয়ে আসেন সাধারণ ক্রেতার কাছে, সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা রমজানে ভোগ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামেন যা কাম্য নয়। যেমন বাংলাদেশে রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই বাড়তে থাকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যা ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ হচ্ছে পণ্যবাজারে করোনার মাসে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রোজার মাসে কেন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে? উত্তরে বলা হবে যে, চাহিদা বাড়ছে তাই জোগান স্বল্পতায় ভারসাম্য আনতে গিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। আদৌ কি তাই? পণ্যগুলো কী পরিমাণ লাগবে এগুলো কি আমাদের অজানা? কোন কোন দ্রব্য কী পরিমাণে দরকার তা জানা থাকলে, কেন পণ্যের জোগান স্বল্পতা দেখা যায়? কেন দাম হু-হু করে বেড়ে যায়? নাকি কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে জোগান স্বল্পতার দোহাই দিচ্ছি আমরা? চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে পূর্ণমাত্রায় ভারসাম্য বজায় থাকবে। শুধু পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করলেই হবে না, সব পেশার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর লক্ষ্য রেখে সরকারকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য ঠিক করে দিতে হবে। সংবিধান মতে ভোক্তা সাধারণের জন্য দাম সহনীয় রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের যার জন্য প্রয়োজন ক্রমাগত বাজার ব্যবস্থাপনা ও বাজার মনিটরিং। তার মধ্যেও ব্যতিক্রমও আছে যেমন একজন ব্যবসায়ী বলছেন দোকান খোলা রাখা হয়েছে লাভের জন্য নয়, কেবল বেঁচে থাকার জন্য, কর্মচারীদের বেতন ও দোকানের ভাড়া পরিশোধের জন্য যা জীবনের এক চমৎকার শিক্ষা বলে বিবেচিত।
বাংলাদেশের রমজান ও ঈদ অর্থনীতি চিরকাল মুদ্রাস্ফীতির জালে জর্জরিত। এ সময় মনোপলি বিজনেস ও হিডেন কস্ট নিয়ন্ত্রণ করে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস হ্রাস করতে হবে। আর তা নাহলে মুদ্রাস্ফীতির চাপে নিষ্পেষিত মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত তাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়। তাছাড়া গণহারে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে ঈদের কেনাকাটায় ধরতে হবে লাগাম। আর তা নাহলে ঈদ-পূর্ববর্তী রমজানে মূল্যস্ফীতি ও ঈদের কেনাকাটায় বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিকে ঈদ-পরবর্তী মন্দায় ভোগাবে। তাই রমজান অর্থনীতি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরা ও বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে সরকার ও ব্যবসায়ীদের আন্তরিক কার্যকর পদক্ষেপ জনগণ আশা করে। বাজার গবেষকবৃন্দ বলছেন নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে একটি বিষয় সব সময় লক্ষ করা যায় যেমন যখন খুচরা ব্যবসায়ীকে প্রশ্ন করা হয় এ পণ্যের দাম বেশি কেন? তার তাৎক্ষণিক উত্তর হবে পাইকারি বাজারে দাম বেশি বলে। কিন্তু একই বাজারে যখন খুচরা বিক্রির তিন দোকানে তিন রকম দাম দেখা যায়, তখন মনে প্রশ্ন জাগে যা গবেষককে ভাবিয়ে তুলে এর কারন কি? এর মানে হচ্ছে, বাজার মনিটরিং বলতে কিছু নেই। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, চিনি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল খাদ্য ও কৃষি খাতের সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। একই পরিস্থিতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, কয়লাসহ প্রায় সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে। এমনকি কৃষির অপরিহার্য উপকরণ সারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী মূল্য মানেই এসব পণ্য বাড়তি দামেই কিনতে হবে বংলাদেশকে। মানুষের জীবন ধারণ, কৃষি, অবকাঠামো, শিল্পসহ পুরো অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক। আন্তর্জাতিক বাজারের অত্যধিক নির্ভরতায় বার বারই দামজনিত অভিঘাতের সম্মুখীন হতে হয় যার একটা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান জরুরি এবং সেক্ষেত্রে দেশে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায় তার দিকে নজর নিতে হবে বিশেষত: করোনাকালে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি বার বার জোর দিচ্ছেন যা বিবেচনায় নিয়ে কৃষি দফতরকে বিশেষ সক্রিয় হতে হবে। ইহা সত্য যে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম সহনীয় না-ও থাকতে পারে যেমন মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে পণ্যের দাম নির্ভর করে নির্বিঘ্ন ও পর্যাপ্ত সরবরাহের ওপর। তাই বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে খাদ্যপণ্যের সরকারি মজুদ বৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের কারসাজির দিকেও কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে, বাজারে চালাতে হবে নিয়মিত অভিযান, দায়ীদের চিহ্নিত করে নিশ্চিত করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে রাষ্ট্রের কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
লেখক: গবেষক, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//



