Sylvia Pandit2

৭১ এর হাতে মেহেদির রং

সিলভীয়া পান্ডীত: শিউলির হাতে তখনো বিয়ের মেহেদির লাল রং শুকায়নি, ওর বর জামান বছর দুই হলো ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। কানাডায় উচ্চ শিক্ষা নিতে যাবে বলে খুব তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করেই কক্সবাজার গিয়েছে মধুচন্দ্রিমা করতে, চারদিন পরেই ওরা ফিরে এসেছে কারণ, শিউলির শ্বশুর ওদের ফিরে আসতে বলেছিল।

উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার শিউলির শ্বশুর গোপন সুত্রে  খবর পেয়েছিল ঢাকায় পাকিস্তান থেকে অনেক সৈন্য এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামি লিগ পলিটিক্যাল পার্টির চিহ্ন মুছে দিতে।

শিউলি আর ওর বর জামান ফিরে আসার পর ওর শ্বশুর বলেছিলেন, “তোমাদের কানাডায় যাবার সবকিছু রেডি, এখন শুধু তোমাদের ব্যাগ গুছাবার পালা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কানাডায় চলে যাও, ঢাকার অবস্থা খুব খারাপ!”

শিউলি ওর শাশুরী এবং শ্বশুরের অনুমতি নিয়ে কানাডায় যাবার আগে কিছু দিনের জন্য ওর বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে।

২৯শে মার্চ, ১৯৭১ সাল রাত নয়টা বেজে তিরিশ মিনিট, শিউলি আর ওর বর জামান রাতের খাবার সবে মাত্র খেয়ে উঠেছে, পরিবারের সবাই বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরে বসে সেদিন টেলিভিশন দেখছে।  শিউলির আদরের একমাত্র ছোট ভাই রন্টি শিউলি কানাডায় চলে যাবে শুনে দুদিন ধরে শিউলির পিছে ঘুরছে আর আর আব্দার করছে শিউলিকে বলছে, “আপু,  আমাকে তোমার সাথে কানাডায় নিয়ে চলো।” রন্টি যত আব্দার করছে আর ঠিক ততটাই ওদের মার বকা  খাচ্ছে। বারো বছরের রন্টি তাঁর শিউলি আপুকে যে ভীষণ চোখে হারায়! শিউলি আপু ছাড়া রন্টির পৃথিবী সত্যি অন্ধকার!  

সে রাতে রাতের খাবার শেষে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের সে ভয়ংকর রাতের পর থেকে চারিদিকে কেমন যেন থমথমে ভাব, পশ্চিম পাকিস্তান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশের নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, মন্দির ভাংছে। হিন্দু পুরুষদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। যাঁরা কোনদিন তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরে আর আসেনি। শুধু তাই না ঘরে ঘরে ঢুকে বর্তমান বাংলাদেশের বিবাহিত, অবিবাহিত মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তরুণী মেয়েদের নিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানী সৈন্যদের মনোরঞ্জনের জন্য। সে এক ভয়ানক অবস্থা! বাঙালিরা ভয়ে অস্থির, কারণ তখন বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালিদের পরিচয় ছিল পাকিস্তানী হিসেবে। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের শুধু ভাষা এবং সংস্কৃতির পার্থক্য ছিল! এ কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে মানুষ মনে না করে কোরবানীর পশু মনে করে মারছিল। কোরবানীর পশুকে জবাই করে মুসলমানরা যেমন আল্লাহর সন্তষ্টি লাভ করে তেমনি পাকিস্তানী সৈন্যরা নিরীহ বাঙালিদের মেরে ভুট্টো এবং ইয়াহিয়া খানের সন্তুষ্টি লাভ করছিল। কতটা নির্দয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের পাকিস্তানীদের মানসিকতা! ভাষা এবং সংস্কৃতির পার্থক্যের জন্য নিজেরা নিজেদের দেশের মানুষকে হত্যা করছিল। টেলিভিশন দেখার ঘরে ঢুকে শিউলি দেখে ওর ছোট্ট ভাইটি মার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। শিউলি ঘুমন্ত রন্টির কপালে একটা চুমু দিয়ে যখন ঘুমাতে যাবে বলে জামানের সাথে কথা বলতে বলতে নিজের শোবার ঘরে যাচ্ছিল ঠিক সে মুহূর্তে জামান শিউলির খুব কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে, “শিউলি আমি ছাঁদে যাচ্ছি, তুমি ঘরে যাও আমি আসছি।”

শিউলি শোবার ঘরে যেই ঢুকতে যাবে ঠিক তখনই ও শোনে কে বা কারা খুব জোরে জোরে ওঁদের সদর দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কার আওয়াজ শুনে শিউলির বাবা দরজা খুলে দেখে এক দল পাকিস্তানী সৈন্য কাঁধে বড় বড় অস্ত্র নিয়ে ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে। দূর থেকে শিউলিকে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একজন সৈন্য দৌড়ে শিউলির কাছে গিয়ে ওর হাত শক্ত করে ধরে ফেলে।

শিউলির হাত ধরার সাথে সাথে শিউলির বাবা চিৎকার করে উঠে। চিৎকার শুনে ওর ছোট্ট ভাইটি ঘুম থেকে উঠে যায় তারপর ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। একজন সৈন্য তখন উর্দুতে বকা দিয়ে বলে “কাঁদবে না, কাঁদলে গুলি করবো।” উর্দুতে বকা শুনে এবং না বুঝে শিউলির ভাইটি আরো জোরে কাঁদতে থাকে। শিউলির মা ছেলেকে ভয় পেয়ে কাঁদতে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে।

পাকিস্তানী সৈন্যরা শিউলির বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমরা তোমার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি।” এই কথা বলে যেই রওনা দেয় অমনি শিউলির ছোট্ট ভাই দৌড়ে এসে যে সৈন্যটা শিউলির হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তাঁর হাত কামড়ে দেয়। কামড় খেয়ে সৈন্যটা ভীষণ রেগে যায়,  তারপর শিউলির ভাইকে এক হাতে তুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলে তারপর আরেকটা সৈন্য ছোট্ট ছেলেটিকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচা মারে। 

ছেলেটিকে বেয়নেটের খোঁচা মেরে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে যখন সৈন্যগুলো হাসছিল আর শিউলিকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল তখন শিউলির বাবা উপায় না দেখে দৌড়ে তাঁর লাইসেন্স করা বন্দুক আলমারি থেকে যখন বের করতে যাবে ঠিক তখন একজন সৈন্য মেশিন গান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে শিউলির মা, বাবা এবং বেয়নেটের খোঁচা খাওয়া ছোট্ট ভাইটিকে মেরে ফেলে। পরিবারের সবাইকে এভাবে প্রাণ হারাতে দেখে শিউলি অজ্ঞান হয়ে যায়।

মেশিন গানের শব্দ শুনে শিউলির বর যখন দৌড়ে নীচে নেমে আসে তখন শিউলিদের পুরোণো কাজের কিশোর ছেলেটি সিঁড়ির মুখে শিউলির বরকে জড়িয়ে ধরে আটকে ফেলে।

১৯৭১ সালের নয় মাসের সেই যুদ্ধে পুরো নয় মাস শিউলি পাকিস্তানী সৈন্যদের অধীনে থেকে প্রতিদিন কয়েক বার করে পাকিস্তানী সৈন্য এবং রাজাকারদের দ্বারা ধর্ষীত হয়েছিল। শিউলির বর আর ওঁদের বাড়ির সেই কিশোর কাজের ছেলেটি যে ছেলেটি শিউলির বরকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল তাঁরা দুজনেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। শিউলির বর জামান কানাডায় উজ্জল ভবিষ্যত গড়তে না গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। শিউলির সাথে জামানের আর দেখা হয়েছিল কিনা তা আর জানা যায় নি।

লেখক: আমেরিকা প্রবাসী, বীরাঙ্গনা স্বীকৃতী আদায়ের আন্দোলন কমী।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//


Comment As:

Comment (0)