সারের মূল্য বৃদ্ধি বনাম খাদ্য নিরাপত্তা
ড: মিহির কুমার রায়: সম্প্রতি ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোয় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদনে এবং এবার বোর মৌসুমে বৃষ্টি কম হওয়ায় সেচের ব্যয়ও বেড়েছে, এরপর রয়েছে-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এ অবস্থায় সারের দাম বাড়ানোয় কৃষক বিপাকে পড়বে, সবকিছু মিলে কৃষি খাতে উৎপাদনের খরচ বাড়বে। অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী মৌসুমে চালসহ কৃষি পণ্য এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প পণ্যের দাম আরও বাড়বে, তবে কেউ কেউ বলছেন, উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও খুব বেশি আশঙ্কার কারণ নেই। গত অক্টোবর মাসে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৬ টাকা, এবার ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৫ টাকা, ফলে এক বছরের মধ্যে সারের মূল্য দুবার বৃদ্ধি পেল। আগে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সারের দাম ছিল ১৬ টাকা কেজি, এখন হয়েছে ২৭ টাকা কেজি, ডিএপি সারের দাম ছিল ১৬ টাকা কেজি, এখন হয়েছে ২১ টাকা, টিএসপি এবং এমওপি সারের দাম ছিল যথাক্রমে ২২ ও ১৫ টাকা কেজি, বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৭ ও ২০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য বৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ বিক্রি মূল্য বাড়িয়েছে সরকার। এরপরও প্রচুর ভর্তুকি রয়েছে রাসায়নিক সারের ওপর। বর্তমানে ইউরিয়া সারের আন্তর্জাতিক মূল্য প্রতি কেজি ৪৮ টাকা, ডিএপি ৭০ টাকা, টিএসপি ৫০ টাকা এবং এমওপি ৬০ টাকা। তাতে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারে ২১ টাকা, ডিএপি সারে ৪৯ টাকা, টিএসপি সারে ২৩ টাকা এবং এমওপি সারে ৪০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রাসায়নিক সারে সর্বমোট ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল ৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ২৮ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি পায়, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে তার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ গ্রহন করছে সরকার এবং ভর্তুকি কমাতে আইএমএফের চাপ রয়েছে যা সারের দাম বাড়ানোর জন্য এটিও একটি কারণ। সারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দামে প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে কৃষি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এছাড়াও দাম বাড়বে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন শিল্প পণ্যের। সামগ্রিকভাবে যা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে। ‘ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে দেশের বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের কাছে বিকল্প ছিল ভর্তুকি বাড়ানো। বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনীতির যে অবস্থা সেখানে ভর্তুকি বাড়ানো কঠিন।’ এদিকে কৃষকরা বলছেন, চলতি মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় উঠবে কিনা-তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বেশি সমস্যায় আছেন বর্গা চাষিরা। তারা বলছেন, সারের দাম বৃদ্ধি এবং অনাবৃষ্টিসহ শ্রমিক ব্যয় ও আনুষঙ্গিক যে ব্যয় হবে, তাতে চলতি মৌসুমে বোর চাষে নির্ঘাৎ লোকসান হবে। এর সঙ্গে তাদের নিজেদের শ্রমের মূল্য যুক্ত করলে লোকসানের পাল্লা আরও ভারি হবে। যে সব জেলায় বেশি ধান উৎপাদন হয়, তার মধ্যে দিনাজপুর অন্যতম। কিন্তু সারের দাম বাড়ানোয় দুশ্চিন্তার কথা বলছেন জেলার কৃষকরা। তাদের মতে, এক একর জমিতে এবার ধান আবাদ করতে খরচ বাড়বে আমনে ৫শ টাকা এবং বোরো আরও বেশি, প্রতি একর জমিতে আমন আবাদ করতে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় ৮০ থেকে ৯০ কেজি, টিএসপি সার লাগে ৪০ কেজি, পটাশ ৪০ কেজি, জিংক ৪ কেজি এবং সালফারের প্রয়োজন হয় ২ কেজি। আর কীটনাশক প্রয়োগ করতে খরচ হয় ৪২শ টাকা থেকে ৪৩শ টাকা। জমিতে হালচাষ, ধান রোপণ থেকে কর্তন পর্যন্ত সারসহ সব মিলিয়ে প্রতি একর জমিতে আমন আবাদ করতে খরচ হতো ৩৪ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। আর ধান আবাদ হয় প্রতি একরে ৪০ থেকে ৪৫ মন। ধান বিক্রি করে অধিকাংশ টাকাই চলে যায় এই উৎপাদন খরচে। কিন্তু হঠাৎ ইউরিয়া সারের দাম বৃদ্ধিতে প্রতি একর জমিতে বাড়তি খরচ গুনতে হয় ৫শ থেকে ৬শ টাকা। তাই ধানের দাম ভালো না পেলে লোকসান গুনতে হবে তাদের।
পঞ্চাশের দশকে দেশে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হতো নামমাত্র মূল্যে, ষাটের দশকে বিএডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সার সংগ্রহ, বিপণন ও বিতরণের দায়িত্ব চলে যায় ওই সংস্থাটির হাতে, ১৯৬৮-৬৯ সালে সারের ওপর ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৮ শতাংশ, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর নাগাদ এর পরিমাণ ছিল ৫২ শতাংশ, এরপর থেকে তা ক্রমাগত হ্রাস পায়, ১৯৯৮-৯৯ সালে রাসায়নিক সারসহ কোনো কৃষি উপকরণ বা উৎপাদিত পণ্যের ওপর একদমই ভর্তুকি ছিল না। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সাল থেকে পুনরায় ভর্তুকি দেয়া শুরু হয়। বর্তমান সরকারের আমলে তা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়, টাকার অংকে এখন ভর্তুকির পরিমাণ যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। কালের পরিক্রমায় রাসায়নিক সারের বিপণন ও বিতরণের ক্ষেত্রেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। পুরো ষাটের দশকে ও সত্তরের দশকের গোড়াতে সার বিপণন ও বিতরণের দায়িত্ব ছিল একচ্ছত্রভাবে বিএডিসির, সত্তরের দশকের শেষ ভাগে পুরোনো বিপণন ব্যবস্থার পরিবর্তে সূত্রপাত হয় এক নতুন বিপণন ব্যবস্থার। ক্রমেই সরকারি খাতের গুরুত্ব তথা বিএডিসির কর্তৃত্ব খর্ব হতে থাকে, সার বিপণনে গুরুত্ব পেতে থাকে বেসরকারি খাত। ১৯৮৫ সালের জুলাই মাস নাগাদ বিএডিসির অধীন ৪২৩টি থানা বিক্রয় কেন্দ্রের প্রায় সবগুলোই বন্ধ হয়ে যায়, মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৯৭ শতাংশই বিতরণ ও বিপণন করা হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। ১৯৯৪ সাল নাগাদ সার বিপণনে মুক্ত বাজার ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু ১৯৯৫ সালের সার সংকটের পর সরকার পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করে সার বিতরণের ক্ষেত্রে। বিদেশ থেকে সার আমদানি, বিপণন ও বিতরণে বিসিআইসি এবং বিএডিসির আধিপত্য হয় বিস্তৃত।
বর্তমানে ইউরিয়া সারের উৎপাদন ও আমদানি পুরোপুরি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন বা বিএডিসি এবং বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা মিলিতভাবে আমদানি করেছে টিএসপি, এমওপি এবং ডিএসপিসহ অন্যান্য সার। তাতে সরকারি খাতেরই প্রাধান্য বিদ্যমান। ভর্তুকির অধিকাংশ টাকাই যাচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর খাতে। বাকি টাকা যাচ্ছে বেসরকারি ঠিকাদার ও আমদানিকারকদের পকেটে। এক হিসেবে দেখা যায়, কৃষি ভর্তুকির ৫৫ শতাংশ পায় বিসিআইসি, ১৮ শতাংশ পায় বিএডিসি, ২২ শতাংশ নেয় বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী এবং বাকি ৫ শতাংশ যায় কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা হিসেবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে টাকা ভর্তুকি হিসেবে নেয় তার বহুলাংশই খরচ হয় রাসায়নিক সারের ‘ট্রেড গ্যাপ’ বা বাণিজ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য। অর্থাৎ এ টাকা খরচ হয় সার আমদানির খাতে।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা বলছেন কৃষকরা বরাবরই মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকেন। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করার চেষ্টা করা হলেও কাজ হয় না’। তাই দাম কিছুটা বৃদ্ধির মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সারের ব্যবহারের প্রবণতা কমবে। এতে জমির উর্বরা শক্তিও ঠিক থাকবে। রাজশাহীর এক কৃষক বলেন চারা রোপণ করতেই ১৪ হাজার টাকা খরচ, এর মধ্যে অনাবৃষ্টির কারণে তাকে সেচ বাবদ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিএমডিএ) দিতে হয়েছে ৩ হাজার টাকা, শ্রমিক বাবদ গুনতে হয়েছে ৫ হাজার, সার বাবদ ব্যয় ২ হাজার, ধানের চারা এবং হালচাষে খরচ আরও ৪ হাজার টাকা। তাই, এক বিঘা জমিতে চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধান মাড়াই পর্যন্ত খরচ হয় ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা আড়াই বিঘা জমিতে খরচ হবে অন্তত ৪২ থেকে ৪৩ হাজার টাকা। কিন্তু এই জমিতে সর্বোচ্চ ৫০ মন ধান হবে, আবার ধান মাড়াইয়ে ৫ মনে ১ মন করে পারিশ্রমিক দিতে হয়, ফলে ঘরে ধান উঠবে ৪০ মন। প্রতি মনের দাম সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা থাকলে আয় হবে ৪০ হাজার টাকা অর্থাৎ ২ থেকে ৩ হাজার টাকা লোকসান হবে। এরপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা তো রয়েছেই, তারপর যদি আবার সারের দামে বাড়তি পয়সা গুনতে হয় তাহলে তো কী করবো বুঝতে পারছি না ।’
একজন বর্গাচাষি বলেন চলতি মৌসুমে আট বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছেন, অনাবৃষ্টির কারণে তাকে সেচ বাবদ প্রথমেই ১৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারের মূল্য বৃদ্ধি। মৌসুমের শুরুতেই ইউরিয়ার দাম বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গবেষকরা বলছেন সারের দাম না বাড়িয়ে সরকারের সামনে বিকল্প ছিল ভর্তুকি বাড়ানো যা বাজেটেও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে ভর্তুকি বাড়ানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে বাড়তি চাপ কমাতেই সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। মনে হচ্ছে, প্রভাব সীমিত আকারে থাকবে। কারণ হিসাব মনে হয়, সারের দাম বাড়ানোর ফলে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ২০ পয়সা বাড়তি ব্যয় হবে। অন্যদিকে যেহেতু চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী এরপর সারের দাম বাড়ানোয়, আগামী মৌসুমে যে চাল বাজারে আসবে, তার মূল্যে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে, অত বেশি আশঙ্কার কারণ নেই। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের বর্তমান দাম ৮১ টাকা, এর ফলে ১১ টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি কেজিতে ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। ডিএপি সারে শতকরা ১৮ শতাংশ নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সারের উপাদান রয়েছে। সেজন্য ডিএপির ব্যবহার বাড়িয়ে ইউরিয়া সারের অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য সরকার ডিএপি সারের মূল্য প্রতি কেজি ৯০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা করে কৃষকদের দিয়ে যাচ্ছে। এ উদ্যোগের ফলে বিগত কয়েক বছরে ডিএপি সারের ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০১৯ সালে ডিএপি ব্যবহার হতো ৮ লাখ টন, বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে ১৬ লাখ টন। ডিএপি সারের ব্যবহার বাড়ার ফলে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে ইউরিয়ার ব্যবহার বেড়েছে। ২০১৯ সালে ইউরিয়া ব্যবহার হতো ২৫ লাখ টন, বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে তিন ধরনের পণ্যের আমদানি, মোট আমদানি ব্যয়ের ৩০ শতাংশের বেশি। এগুলো জ্বালানি, খাদ্য এবং সার। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তিন ধরনের পণ্যের দামই অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে। এতে সারে সরকারের ভর্তুকিও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত সাড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। আরও একটি হিসাবে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ সাল থেকে ২০২২-২৩ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে যার অধিকাংশই আচ্ছাদিত ভর্তুকি। রাসায়নিক সারে প্রদত্ত এই ভর্তুকির সুবিধা যারা বেশি ভোগ করেন তারা মাঝারি ও বড় কৃষক। ছোট কৃষকদের শরিকানা এতে খুবই কম। অথচ ভর্তুকি এদের জন্যই বেশি দরকার। এমতাবস্থায় আমাদের প্রয়োজন হলো আচ্ছাদিত ভর্তুকির পাশাপাশি গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বাছাইকৃত ভর্তুকি। ঢালাওভাবে সবার হাতে সমভাবে কৃষি ভর্তুকির সব টাকা তুলে না দিয়ে প্রগ্রেসিভ হারে সরাসরি কৃষকের হাতে ওই ভর্তুকির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা নগদ পৌঁছে দেয়া উচিত। এর জন্য এ সরকারের আমলে করা প্রায় ১ কোটি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং প্রায় দেড় কোটি কৃষি উপকরণ কার্ড অথবা প্রস্তাবিত ১ কোটি ৮০ লাখ স্মার্ট কার্ড কাজে লাগানো যেতে পারে। এ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পরোক্ষভাবে প্রদত্ত আচ্ছাদিত কৃষি ভর্তুকির বিষয়টি খুবই সেকেলে মনে হয়।
প্রতি বছর সার, বিদ্যুৎ, ডিজেলসহ কৃষি সরঞ্জামের দাম বাড়ে, আর চাষাবাদে নিজের পারিশ্রমিক হিসাব করলে লোকসান হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষকের আত্মহত্যা ছাড়া উপায় থাকে না। সরকারি যেসব বরাদ্দ আসে, সেগুলো প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। এমন পরিস্থিতি সারের দাম বৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বর্ষার মৌসুমে সার বেশি ব্যবহার হয়, ১ একর জমিতে প্রায় ১শ কেজি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়, তবে এই সারের দাম বৃদ্ধির ফলে অনেক খরচ বাড়বে।
ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইনস্ কাউন্সিল (আইজিসি) বলছে, ২০২২-২০২৩ সালে বৈশ্বিক খাদ্যোৎ্পাদন কমে যাবে, মজুতও গত আট নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হবে। বিশ্বে খাদ্যোৎ্পাদন যে কমে যাবে তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আর এর পেছনে রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ। প্রত্যক্ষ কারণ হলো—যুদ্ধের কারণে দেশ দুটির খাদ্যশস্য রপ্তানি বাধাগ্রস্থ হওয়ায় গুদামে খাদ্যশস্য পচে যাচ্ছে এবং পচে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে যুদ্ধরত দেশ দুটির চাষিরা স্বাভাবিকভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদনে নিরুতৎসাহিত হবে। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাবে। অন্যদিকে রাশিয়া বিশ্বের তৃতীয় জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারী দেশ এবং বিশ্বে গ্যাস রপ্তানিতে অন্যতম। রাশিয়া ইউরোপের গ্যাসের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশের জোগানদাতা। আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া ইউরোপে তাদের জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। হু হু করে বেডে যাচ্ছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম। ফলে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিকারক বিভিন্ন দেশের সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার খরচ বাডছে, যা পরোক্ষভাবে ঐসব দেশে খাদ্যোৎ্পাদন হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা-ডব্লিউএফপি বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এতবড় খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হয়নি বিশ্ব। সামনে খারাপ সময় অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করছে সংস্থাটি। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো প্রকট হলে আমদানি-নির্ভর দেশগুলো বেকায়দায় পডবে। এমতাবস্থায়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাটা অতি জরুরি। বিশ্ববাসীর খাদ্যচাহিদা পূরণে বিশ্ব নেতারা যুদ্ধ বন্ধসহ খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেই প্রত্যাশা।
বাংলাদেশও এর সাথে সহমত পোষন করছে যাতে আগামী দিনেও এই সংকট কাটিয়ে দেশ সামনের দিকে যাবে যা বর্তমান সরকার এতে আশাবাদি বলে প্রতিয়মান হয় ।
লেখক: গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//



