কোরবানির পশুর বাজার ব্যবস্থাপনা ও ঈদের অর্থনীতি

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর: উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

ড: মিহির কুমার রায়: স্বাধীনতা-উত্তরকালে যুদ্ধবিধ্বস্থ বাংলাদেশ পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতা করে আসছে জাপান। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রতি জাপানের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা দুদেশের আন্তরিকতার স্মারক। যার ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে গত ২৫ এপ্রিল ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান গিয়েছিলেন। মহামারি কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার আগে ২০১৯ সালে সর্বশেষ সফরের পরে তিন বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফর করছেন। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং চলমান কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে এই সফরটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। উভয় দেশ এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা জোরদারের বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার কার্যালয়ে পৌঁছলে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত হওয়ার কথা জানিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা ও সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয়েই দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, আগামীতে এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিশিদা এবং আমি আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব কিছু নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আনন্দিত যে বাংলাদেশ ও জাপান সফলভাবে বিদ্যমান সম্পর্ক ‘ব্যাপক অংশীদারিত্ব’ থেকে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পর একই স্থানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা বিবৃতি দেন। যৌথ বিবৃতির আগে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষি, মেট্রো রেল, শিল্প উন্নয়ন, জাহাজ রিসাইক্লিং, শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়, মেধাসম্পদ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আইসিটি এবং সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা ইত্যাদি। এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক আমাদের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। 

জাপানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের বৈঠকে তারা ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে আইনের শাসনের ভিত্তিতে অবাধ ও উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমুন্নতের দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন। এখন বিশ্ব ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ‘টার্নিং পয়েন্ট’, তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করতে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। গত মাসে ঘোষিত অবাধ এবং উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক পয়েন্টের জন্য নতুন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের বৈঠকে জাপান ও বাংলাদেশ বিস্তৃত ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। কিশিদা বলেন, আমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাপানের সম্ভাবনা-বাংলাদেশ ইকোনমিক অংশীদারিত্ব চুক্তির বিষয়ে যৌথ সমীক্ষায় ব্যাপকভাবে এগিয়ে যেতে সম্মত হয়েছি।

উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য। আমাদের প্রত্যাশা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফুমিও কিশিদা বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। আমরা এই ইস্যুতে সহায়তা অব্যাহত রাখব। এদিকে, যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন বলেন, আমি নিশ্চিত আমাদের দুই দেশের জনগণ এবং আমাদের সরকারের মধ্যেকার বিদ্যমান চমৎকার বোঝাপড়া, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা আগামী বছরগুলোতে আরও শক্তিশালী হবে। ঢাকা-নারিতা সরাসরি ফ্লাইট চালু প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি এই বছরের মধ্যে ঢাকা-নারিতা সরাসরি ফ্লাইট চালু হতে যাচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বঙ্গোপসাগর এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোকে সংযুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণাঞ্চলে উন্নয়নের জন্য মহেশখালী-মাতারবাড়ি ইন্টিগ্রেটেড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট উদ্যোগ এবং বিগ-বি উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার হওয়ায় আমরা জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। সামনের দিনগুলোতে আমরা একটি অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) সম্পাদন করার অপেক্ষায় আছি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপানের সহযোগিতা চাওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা করেছি, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। আমরা জাপানকে অনুরোধ করেছি মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এ সংকটের একটি টেকসই সমাধান খুঁজতে। জাপানের আতিথেয়তার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিশিদা এবং জাপান সরকার আমাকে এবং আমার প্রতিনিধিদলকে যে আতিথেয়তা দেখিয়েছে তাতে আমরা গভীরভাবে মুগ্ধ। তিনি বলেন, সুন্দর দেশ জাপানে আসাটা আনন্দের, জাপান সব সময় আমাদের হৃদয়ে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তির পর সরকারি সফরে টোকিওতে আসতে পেরে আমি বিশেষভাবে আনন্দিত, জাপান বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি যে কয়েকটি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে জাপান তাদের মধ্যে অন্যতম, ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক সফরের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কৃষিমন্ত্রী ড. মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক উপস্থিত ছিলেন।

জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার এবং সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, কারণ জাপান বাংলাদেশকে ২০২৬ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এই সহায়তাগুলো আমাদের অর্থনীতি এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনে সাহায্য করেছে সন্দেহ নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ত্রুটিগুলো প্রশমনে জাপান বাংলাদেশকে সহায়তা করে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে জাপান ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে বলে আমরা আশাবাদী। স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় আটটি চুক্তি আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে একটি নতুন মাইলফলক বলে মনে করি। এটি উভয় দেশের সাধারণ মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করার এবং পরস্পরের প্রজ্ঞা ও দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ করে দিয়েছে। এর বাস্তবায়নে বাংলাদেশের তরুণদের নিজ নিজ কারিগরি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতে এবং উন্নত পেশাদার হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষমতা বাড়বে। গত ২৭শে এপ্রিল সকালে টোকিওতে জাপানি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের আগস্টে বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে ৩.২ বিলিয়ন মূল্যের বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা ঋণ পেয়েছিল, যমুনা রেলওয়ে সেতু এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ সাতটি বড় প্রকল্পের উন্নয়নে এই ঋণ দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় অনুষঙ্গ হলো গত ৫২ বছরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের প্রসারতা। আমরা আশা করি বন্ধুত্ব, বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্কের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ ও জাপান আগামী বছরগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতার সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অংশীদারত্বকে দৃঢ় করার জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে এগিয়ে যাবে।

লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিথার্সিটি, ঢাকা।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//


Comment As:

Comment (0)