বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভাবনা: অগ্রগতি ও করনীয়
ড: মিহির কুমার রায়: বিনিয়োগ উন্নয়নের পূর্ব শর্ত যা দেশি কিংবা বিদেশিই হউক না কেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ কিংবা বৈদেশিক ঋণ নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে তা এর আগে তেমন দেখা যায় নি। সামনে সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন এবং আর এক মাস পরই আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষনার কথা রয়েছে। তাই বিনিয়োগ ও ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি বাজেটেরই আলোচনার বিষয় হিসাবে অন্তর্ভূক্তিতে রয়েছে। এখন প্রথমে আসা যাক বিনিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় যা বেশ কয়েক বছর ধরেই একটি স্থবিরতার মধ্যে রয়েছে, যা জিডিপির মাত্র ৩১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি মিলে আর বিদেশি বিনিয়োগ সেত অনেকটা সোনার হরিণের পর্যায়ে রয়েছে। তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আশার কথা বলা হেচ্ছে বিভিন্ন মহলে যা অনেকটা নিরাশার মধ্যে আশার আলো যোগাচ্ছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নযন সংস্থার (আঙ্কটাড) সর্বশেষ প্রতিবেদনে যা গত বছরের ৯ জুন প্রকাশিত ‘ওযার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট (ডব্লিউআইআর)-২০২২’ বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ২০২১ সালে ৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে যার ফলে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের পর দ্বিতীয শীর্ষ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগের যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৩৫০ কোটি ৪০ লাখ (৩.৫০ বিলিয়ন) ডলারের এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি, ২০২১-২২ অর্থবছরের এই আট মাসে ৩১৩ কোটি ১০ লাখ (৩.১৩ বিলিয়ন) ডলারের এফডিআই এসেছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে নিট এফডিআই বেড়েছে ৫ শতাংশ। এই আট মাসে ১৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নিট এফডিআই এসেছে দেশে। গত বছরের এই সময়ে এসেছিল ১৪৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৪৭০ কোটি ৮০ লাখ (৪.৭১ বিলিয়ন) ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে, যা ছিল আগের বছরের (২০২০-২১) চেয়ে ৩৯ শতাংশ বেশি, নিট এফডিআই বেড়েছিল আরও বেশি, ৬১ শতাংশ। গত অর্থবছরে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২.১৮ বিলিয়ন ডলার, তার আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৩৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ, নিট এফডিআই এসেছিল ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট অঙ্ককে নিট এফডিআই বলা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩২৩ কোটি ৩০ লাখ (৩.২৩ বিলিয়ন) ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। নিট বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ১২৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল দেশে। এর মধ্যে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২৬৩ কোটি ডলার। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসে এই বছর। এর মধ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে জাপানের কোম্পানি জাপান টোব্যাকো। আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কেনা বাবদ প্রায় ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগ করেছিল তারা। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে যে এফডিআই দেশে এসেছে, বছরের বাকি চার মাসে (মার্চ-জুন) সেই হারেও যদি আসে, তাহলে অর্থবছর শেষে মোট এফডিআইয়ের পরিমাণ ৫.২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড।
করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকেই দেশে বিনিয়োগের আবহ তৈরি হয়, ২০২২ এর ২৫ জুন বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু চালু হয়েছে, এই সেতু ঘিরে কয়েক মাস ধরে দেশে বিভিন্ন খাতে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছিল, সে কারণেই শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটাল মেশিনারি, পরিবহন খাতের বাস-ট্রাক তৈরির যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য খাতের সব ধরনের যন্ত্রপাতি-সরঞ্জামের আমদানি বেশ বাড়ছিল অর্থাৎ সব মিলিয়ে দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে আমদানির লাগাম টেনে ধরতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ায় এখন আমদানি ব্যয় বেশ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছিল ৪১ শতাংশের মতো, কিন্তু চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরিমাণ কমেছে ৫৭.১১ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি কমেছে ৩০ শতাংশ, মধ্যবর্তী পণ্যের এলসিও কমেছে ৩৩ শতাংশের বেশি। এদিকে নানা উদ্যোগের পরও কাটছে না ডলার সংকট। পণ্য আমদানির জন্য পর্যাপ্ত ডলার পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো, রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, এক বছর আগে এই রিজার্ভ ছিল ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি, ২০২১ সালের আগষ্টে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। বেশ কিছুদিন ধরে দেশে বিনিয়োগ একই জায়গায় আটকে আছে; জিডিপির ৩০ থেকে ৩১ শতাংশের মধ্যে, ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছেই, দেশি বিনিয়োগ যদি বাড়ে, ডলারের বাজারের অস্থিরতা যদি কেটে যায়, তাহলে দেশে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগই বাড়বে।’
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্রে জানা যায়, আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতে কোরিয়া, চীন ও হংকং থেকে উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, ব্যাংক, টেলিকমিউনিকেশন খাতেও কিছু বিনিয়োগ এসেছে। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী বিদেশি কোম্পানিগুলো তিনভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে: মূলধন হিসেবে নগদ বা শিল্পের যন্ত্রপাতি হিসেবে, বাংলাদেশে ব্যবসা করে অর্জিত মুনাফা বিদেশে না নিয়ে পুনর্বিনিয়োগ করে এবং এক কোম্পানি অন্য কোম্পানি থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারে, এই তিন পদ্ধতির যে কোনোভাবে দেশে বিনিয়োগ এলে তা এফডিআই হিসেবে গণ্য করা হয়। গত অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, তারা মোট বিনিয়োগের প্রায় ১৭ শতাংশ বিনিয়োগ করেছে, দ্বিতীয় অবস্থানে সিঙ্গাপুর, তারা মোট বিনিয়োগের ১৬ শতাংশের মতো বিনিয়োগ করেছে, তৃতীয় অবস্থানে নেদারল্যান্ডসের বিনিয়োগ ৮ শতাংশ। এ ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, চীন, মিসর, যুক্তরাজ্য, হংকং এবং অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ এই পাঁচ অর্থবছরে দেশে মোট ২৫.১০ বিলিয়ন ডলার এফডিআই এসেছে যার মধ্যে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ১৭.৬৮ বিলিয়ন ডলার। এদিকে গত ১২ মার্চ দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশ বিজনেস সামিট’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা আসুন, বিনিয়োগ করুন, বাংলাদেশ সব সময় প্রস্তুত আপনাদের আগমনের জন্য। এই সামিটে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সাতটি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে বলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় এবং খাত সাতটি হচ্ছে- অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন, বস্ত্র ও চামড়া, স্বয়ংক্রিয় ও হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তেল, গ্যাস ও সমুদ্র অর্থনীতি। ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে বিদেশি বিনিয়োগে, সংকটের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াকে দেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর বলছেন তারা। বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়, গত দুই বছরের করোনা মহামারির পর এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সূচক বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, এ পরিস্থিতিতে এফডিআই বাড়াকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি প্রমাণ করে বলে জানিয়েছেন তারা। বেশ কিছুদিন ধরে দেশে বিনিয়োগ একই জায়গায় আটকে আছে; জিডিপির ৩০ থেকে ৩১ শতাংশের মধ্যে। ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছেই। দেশি বিনিয়োগ যদি বাড়ে, ডলারের বাজারের অস্থিরতা যদি কেটে যায়, তাহলে দেশে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগই বাড়বে।’
উপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে বৈদেশিক বিনিয়োগের একটি উজ্জল সম্ভাবনা বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে যা কেবল সরকারের গতিশীল নেতৃত্বের কারনেই সম্ভব হযেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর, বিশ্বব্যাংকের সদর দফতর সফর সহ সব সময়েই বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে এসে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। এ থেকে প্রতিয়মান হয় তিনি দেশকে কতটুকু ভাল বাসেন। সামনে নির্বাচন যার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে। আবার উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতার প্রয়োজন হবে। আসুন সকলে মিলে দেশটাকে ভালবাসি ও উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখি।
লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডিন (সিটি ইউনিভার্সিটি), সাভার, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//



