মিহির স্যার

আসন্ন বাজেট: রাজস্ব আহরনে ঘাটতি বিবেচনায় আনা জরুরী

ড: মিহির কুমার রায়: ডলার সংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও ঋণপত্র বা এলসিতে কড়াকড়ি আরোপের ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আয় কমেছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের নয় মাস ঘাটতি থাকা রাজস্বের অর্ধেকেরও বেশি আমদানি পর্যায়ের (কাস্টমস)। এ খাতে ঘাটতির পরিমাণ ১৫ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যেখানে মোট ঘাটতি ২৯ হাজার ৮ কোটি টাকা (এনবিআর সূত্র), চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা তা গত অর্থবছরে যদিও ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, কাস্টমস থেকে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১১ হাজার কোটি, স্থানীয় পর্যায়ে মূসক (ভ্যাট) থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ১ লাখ ২২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম নয় মাস অর্থাৎ মার্চ পর্যন্ত কাস্টমস থেকে ৮৩ হাজার ১৮৭ কোটি, ভ্যাট থেকে ৯৫ হাজার ১৪৫ কোটি এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ৭৬ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল যদিও এর সবক’টি খাতেই এ সময়ে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এনবিআর। সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি কাস্টমসে। এর পরই ভ্যাট খাতে ঘাটতি ৮ হাজার ২৪৪ কোটি এবং আয়কর ও ভ্রমণ করে ৪ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা ঘাটতি।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, অর্থবছরের বাকি তিন মাসেও রাজস্ব আয়ে ঘাটতি অব্যাহত থাকবে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। বরং বছর শেষে কাস্টমস খাতে বড় ঘাটতি তৈরি হবে, যার প্রভাব পড়তে পারে বাজেটের অন্যান্য খাতেও, বিশেষ করে নতুন শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে তৈরি হবে ধীরগতি। ফলে ভ্যাট ও আয়করের ওপরেও তার প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এদিকে আমদানি শুল্ক কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে দেশে ডলারের সংকট থাকায় আমদানি নীতিতে কড়াকড়ি, ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়া, ঋণপত্র খুলতে না পারা, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং বিলাসী দ্রব্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আয় কমে গেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে সরকার অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানিকে নিরুৎসাহিতের একটা চেষ্টা করেছে, সেজন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে নানা রকম কড়াকড়ি এসেছে, সেটলমেন্টও কমেছে, আমদানি ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ায় এ খাত থেকে শুল্ক আদায়ও কমে গেছে। এখন পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক রয়েছে এবং শেষেও এটা নেতিবাচকই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এনবিআরের কাঁধে চলতি অর্থবছরে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য চাপালে অর্থনীতিবিদরা সেটিকে অস্বাভাবিক বলে মন্বব্য করেছিলেন। বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় বিশাল এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে অসম্ভব বলেই তাদের মত। অবশ্য ‘আশাবাদী’ এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, শিগগিরই ডলার সংকট কেটে যাবে। অর্থবছরের শেষ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে আবারো গতি ফিরবে, রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

এই আশায় সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করে আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা, এর মধ্যে এনবিআর কর হচ্ছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর কর ২০ হাজার কোটি টাকা এবং এনটিআর থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে আগামীতে রাজস্ব আরও বাড়বে বলে আশা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আয় বাড়াতে সংস্কার কার্যক্রমে হাত দেবে, ভ্যাট আদায় বাড়াতে জুন থেকে ইএফটি মেশিন স্থাপন কার্যক্রম শুরু করা হবে, বাড়ানো হবে কর আদায়ের ক্ষেত্রও। অর্থনীতিবিদগন বলছেন বিদেশি ঋণের চাপ কমাতে হলে আভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তবে কর আহরণ বাড়াতে যে ধরনের সংস্কার দরকার তা এখনও করা হয়নি। রাজস্ব খাতে কার্যকর সংস্কার ছাড়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না।

এখানে উল্লেখ্য যে করোনা মহামারির প্রভাব থেকে দেশের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সব সময় চ্যালেঞ্জিং যা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। চলমান বছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মতো অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন আমদানি ও রফতানি, ভোগ্য দ্রব্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সরবরাহ, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি প্রভৃতি ফিরে আসবে কিনা তা নির্ভর করছে বৈশ্বিক পরিস্থিতির গতি প্রকৃতির উপর। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতি বাস্তবায়নের সামর্থ্য সময়ের স্বল্প পরিসরে অর্জন করা সম্ভব হবে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। এবার বাজেটের শুল্ক কর-সংক্রান্ত পরিবর্তনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের ঊর্ধ্ব বা নিম্নমুখী প্রবণতা, দ্রব্য মূল্য প্রভৃতি অনেকটা নির্ভর করে বাজেটে শুল্ক কর নির্ধারণের দক্ষতার উপর। সর্বোপরি রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও এ শুল্ক কর নির্ধারণের প্রভাব অনস্বীকার্য। তা ছাড়া চলতি বাজেটের রাজস্ব নীতি পুরোটাই ব্যবসা বান্ধব হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাজেট প্রস্তুতির প্রাক্কালে দেশের কর ব্যবস্থা নিয়ে শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ী নেতাদের ক্ষোভের অন্ত ছিল না, দেশে অগ্রিম কর দেয়ার বিধান চালুর পর কর আহরণে যেমন বৈপ্লবিক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল, তেমনি কর ফাঁকি বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এ যাবৎ দেশে যে কর কাঠামো বিরাজমান ছিল তার মধ্য থেকেই দেশে বহু ছোট-বড় উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, বিনিয়োগ বেড়েছে, রফতানি বেড়েছে। বলতে গেলে অনেক কোটিপতিও জন্মেছে। এর কারণ অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও রফতানিতে প্রচুর শুল্ক করে ছাড় ও নীতিসহায়তা। উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণে কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রে আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের মুনাফা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর উপর কারো কারো কর ফাঁকির প্রবণতাও উড়িয়ে দেয়া যায়না। তবে আশা করা হয়েছে, এর ফলে দেশে বিনিয়োগসহ কর্মসংস্থান বাড়বে এবং রাজস্বও বাড়বে। এ ব্যাপারে কতিপয় সুপারিশ হলো: ক. রাজস্ব প্রশাসনের জনবল বৃদ্ধি ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে যাতে রাজস্ব সংগ্রহে গতি সঞ্চার করা যায়; খ. কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের কর্মকর্তাদের কৌশলী হতে হবে বিশেষ করে কর আহরণ ব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন ও মেশিনের ব্যবহার করতে হবে; গ. দেশে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির অনুষঙ্গ হিসেবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে অবশ্যই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য বাংলাদেশের কর জিডিপির অনুপাত ৮% এর নিচে যা দক্ষিন এশিয়ায় সর্বনিম্ন এবং সম্প্রতি আইএমএফ টিম বাংলাদেশ সফরের সময় বলে গেছেন এই অনুপাত অবশ্যি ১০% এর উপরে উন্নিত করতে হবে: ঘ. কাস্টম আইন কয়েক বছর ধরে সংসদে পাশের অপেক্ষায় আছে যা অবশ্যই তড়িৎ পাশের ব্যবস্থা করতে হবে; ঙ: রাজস্ব আয়ের আহরণের একটি বড় প্রতিষ্ঠান হলো এন,বি,আর যার সাথে সরকারের স্থায়ীত্বশিলতার প্রশ্নটি জড়িত। সেক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নৈতিক ভিত্তি তথা প্রশাসনিক কাঠামো আরো জোরদার করতে হবে, নতুন নতুন করদাতা সংগ্রহ উপজেলায় আরও অফিস স্থানান্তর করতে হবে এবং বেশী বেশী কর মেলার আয়োজন নতুন অঞ্চলগুলোতে করতে হবে। আবার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের মান উন্নয়ন ও অব্যাহত দুর্নীতি প্রতিরোধে উদ্যেগী মন্ত্রনালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ মন্ত্রনালয়ের অর্থ অনুবিভাগকে উন্নয়নের সহযাত্রী হিসাবে কাজ করতে হবে; চ. প্রসংগটি হলো বৈশ্বিক অবস্থার উন্নতি না হলে দেশের আমদানী-রফতানীতে পুর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে সময় লাগবে তার সাথে যুক্ত হতে পারে বৈদেশিক ও আভ্যন্তরীন বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মহীনতা, ভোগ চাহিদা ও সরবরাহ চেইনে বাধাগ্রস্থতা, রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা ইত্যাদি। বর্তমান সরকার যে গতিতে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে তা আন্তর্জ্যাতিকভাবে প্রশংশীত হয়েছে এবং অর্থনীতি আবার ঘুরে দাড়াতে পাড়বে কারন প্রবৃদ্ধির চেয়ে এখন টিকে থাকাটাই বিবেচ্য বিষয়; ছ. আয়কর আইনের পরিবর্তনের ফলে প্রত্যক্ষ কর কমে যেতে পারে এবং কাল টাকার সাদা করার/পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা বিষয়টি উন্মোক্ত করায় এই সুযোগটিও সদ্ব্যবহার করা উচিত। রফতানি শুল্ক হারে যে সকল পরিবর্তন এসেছে তা বিনিয়োগ তথা ব্যবসাবান্ধব বিশেষত: করোনার সৃষ্ট অর্থনৈতিক অবস্থা ও ব্যবসায়ীদের চাহিদার বিবেচনায়। কিন্তু ইন্টারনেট ও সিম ব্যবহারে যে মুসক চলতি বছরের বাজেটে বৃদ্ধি করা হয়েছে তাতে হয়ত রাজস্ব বাড়বে কিন্তু সমালোচনা বাড়বে অনেক বেশী। আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাব থেকে এক্সাইজ কর কেটে নেয়া অজনপ্রিয় আর একটি পদক্ষেপ যা আমানতের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বড় বাজেট কোন সমস্যা নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অপচয় কমাতে হবে, সরকার ষোষিত যে প্রনোদনা ঘোষনা দেওয়া হয়েছে তা সঠিক সময়ে যোগ্য লোকদের হাতে যাতে যায় এদিকে নজর দিতে হবে; জ: সর্বশেষ: বাংলাদেশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে বড় উলম্ফন হতে যাচ্ছে- এ ধরনের অনুমান আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ভুল বার্তা দিতে পারে যা কোভিড মোকাবিলায় তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন প্রবৃদ্ধির চেয়ে মানুষের জীবনযাত্রা ও কর্মসংস্থান কতটা টেকসই হবে, সেদিকে নজর রাখতেই হবে। বাজেট বছরে সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও জাতীয় পুঁজি সংবর্ধন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে আশাতিত প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়তো সহজ হবে। দেশে বর্তমানে ৮৮ লাখ টিন ধারী রয়েছে যাদের মধ্যে মাত্র ২৮ লাখ টিনধারী তাদের রিটার্ন জমা দেয় যা খুবই দু:খজনক ও অনাকাঙ্কিত। অথচ এনবিআর তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনী ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অথচ কর প্রশাসন থেকে সরকারের একটা বড় রাজস্ব আসে যার টার্গেট কোন বছরেই পূরন হয়না। এর কারনে সরকারের ঘাটতি বাজেট বেড়েই চলছে যা আগাম বাজেটে এখন পর্যন্ত প্রাক্কলন করা হয়েছে জিডিপির ৫.২%। এই ঘাটতি পূরনে ব্যাকিং খাত থেকে কোটি কোটি টাকা সুদ সহ ঋণ নিয়ে সরকার দেশের বিনিয়োগের ধারা নষ্ট করছে, অপর দিকে স্থবিরতাকে উৎসাহিত করছে যা কাম্য নয়। তাই করের মাধ্যমে সরকারের আয়বৃদ্ধি করে দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবে সেটাই একমাত্র গ্রহনযোগ্য সমাধান।

লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডীন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//


Comment As:

Comment (0)